গুঞ্জন রহমান

সঞ্জীব চৌধুরীকে নিয়ে আমি লিখতে চাইনি। কেন জানি না, তাঁর কথা ভাবতে গেলেই তাঁর গানের কথাই ঘুরেফিরে মনে আসে, ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন...?’ এমনিতেই আমার চোখে অনেক সমস্যা। আমি চশমা ছাড়া কোনো লেখা পড়তে পারি না। আর কলম দিয়ে লিখতে গেলে চশমা পরেও লিখতে পারি না। কারণ, লেখার সময় কাগজের যতটা কাছে চোখ চলে যায়, সেই দূরত্ব থেকে সব ঝাপসা দেখায়। বাঁচার কথা, এই লেখা আমি কাগজের ওপর কলম দিয়ে নয়, লিখছি সরাসরি কম্পিউটারের স্ক্রিনে।
আমি সঞ্জীব চৌধুরীর গান প্রথম শুনি দলছুট ব্যান্ডের অ্যালবামে, সেটা সম্ভবত এই ব্যান্ডের দ্বিতীয় অ্যালবাম। দ্বিতীয়টা শুনে এতটাই বিমোহিত হই যে, খুঁজে পেতে প্রথম অ্যালবামটি কিনে ফেলি। রাজশাহীর মতো ছোট শহরে তিন-চার বছর আগে রিলিজ হয়ে বিক্রি হয়ে যাওয়া অ্যালবাম সহজে পাওয়ার নয়। সে যাই হোক, দ্বিতীয় অ্যালবামের নাম ছিল সম্ভবত ‘হৃদয়পুর’, আর প্রথমটার ‘আহ্!’ আমার ভুলও হতে পারে। এখনই গুগলে সার্চ দিলেই সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে, কিন্তু আমার ইচ্ছে করছে না। থাকে যদি তো থাকুক কিছু ভুল।
সঞ্জীব চৌধুরীর গোটা জীবনটাই আমার কাছে ভুলে ভরা মনে হয়। মনে হয়, এক অমিত সম্ভাবনার অসামান্য আধারের অমার্জনীয় অপচয়। মনে হয়, অমৃত সুধায় কানায় কানায় ভরা একটি পাত্র কেউ পরিবেশন করলেন তাঁর খুব প্রিয় বন্ধুর কাছে, তারপর সেই বন্ধুটি পাত্রের জন্য হাত বাড়াতেই, কেন জানি না, তিনি নিজেই সে পাত্রটি উল্টে দিলেন। একেবারে উপুড় করা নয়, কাত করে ফেলে রাখলেন টেবিলের ওপর। অসামান্য সে পানীয় গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে, বেচারা বন্ধু আর কী করে, সেখান থেকেই চেটেপুটে খাচ্ছে, পাত্রের ভেতর এখনো সামান্য জমে আছে, সেটুকু কখন উপচে পড়বে আর কখন সে চেটে খেতে পারবে, তার অপেক্ষায় গভীর অনিশ্চয়তা নিয়ে বসে আছে। আমাদের অবস্থা হয়েছে সেই বন্ধুটির মতো।
আর পরিবেশনকারী স্বয়ং সঞ্জীব চৌধুরী, যিনি পাত্র উল্টে অপচয় করলেন নিজেরই জীবনের অনবদ্য অমৃত রস, অপার সম্ভাবনা। তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা আছে সম্ভবত ব্রেইন হেমারেজ, কিন্তু আমি জানি, সেটা আত্মহত্যা ছিল। একবার দুবারের চেষ্টায় নয়, দিনের পর দিন, দীর্ঘ পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত প্রয়াসে তিনি একটু একটু করে হত্যা করেছেন নিজেকে। কী কারণ, কিসের এত অভিমান, আমি তা জানি না। তবে অনুমান করতে পারি, তিনি ভুল সময়ে জন্মেছিলেন। আমার বন্ধু তানভীর চৌধুরী গান লিখেছিল, ‘এমন মরার দেশে/ ভুল করে চলে এসে/ অনেক কষ্ট নিয়ে/ রীতিমতো রেগে গিয়ে/ বহু আগে হেরে যাওয়া বেহিসেবি ঈশ্বর!’ সঞ্জীব চৌধুরী আমার কাছে এই ‘মরার দেশে ভুল করে চলে আসা’ এবং ‘বহু আগে হেরে যাওয়া বেহিসেবি ঈশ্বর’। অনেক আগে থেকেই হেরে যাওয়ার ব্যাপারটা তিনি জানতেন। জানতেন বলেই নিজেকে ধ্বংস করতে শুরু করে দিয়েছিলেন পুরোদমে। কারণ, মানতে পারতেন না যে তিনি হেরে গেছেন।
কর্মজীবনে পুরোদস্তুর সাংবাদিক ছিলেন। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের আধুনিক যুগে উত্তরণের সময়কালটায় ছিলেন পুরোভাগে। সাপ্তাহিক একতা, দৈনিক আজকের কাগজ, ভোরের কাগজে। বামধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। চোখের সামনে মার খেতে দেখেছেন, নিজেও মার খেয়েছেন, মরে যেতে দেখেছেন সহযোদ্ধা সহপাঠী, সহকর্মীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আদমজী পাটকল সবখানে এরশাদশাহির জুলুম-নিপীড়ন দেখেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, প্রতিরোধ করেছেন। রাজপথে ব্যারিকেডে দাঁড়িয়েছেন যেমন, তেমনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বরচিত গানে তীব্র প্রতিবাদের আগুন জ্বেলেছেন। ‘...আমার স্বপ্নের কথাগুলো বলতে চাই...’!
গণমানুষের মুক্তির গান, স্বপ্নের কথা তাঁর চেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে আর কে ছুড়ে দিয়েছে এমন সোচ্চারে? এত সাহস আর কার ছিল? আজ যখন ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু সাংবাদিক নামের কলঙ্ককে দেখি কোনো কোনো খুনে-শিল্পপতির তৈলচিত্র আঁকতে গিয়ে বলে, লোকটির সারা শরীরটাই কলিজা, তখন আমি হতভম্ব হয়ে যাই, আর আমার মনে পড়ে যায় সঞ্জীব চৌধুরীর কথা। সারা শরীরজুড়ে কলিজা যদি কারও থেকে থাকে, তো সেটা তাঁরই ছিল। আক্ষরিক অর্থেই ছিল। সত্যের সঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য তিনি বহুদূর পর্যন্ত যেতে পারতেন।
আজ যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন, তাই আজ বড়দিন। আজ সঞ্জীব দা’রও জন্মদিন, আজ দিনটা তাই সত্যিই বড়। তিনি নেই, দিনটা পড়ে আছে। আর পড়ে আছে তাঁর অসামান্য সৃষ্টি অসামান্য সব গান। আর স্ফুলিঙ্গের মতো উত্তুঙ্গ তাঁর জীবনবোধ ও প্রেরণাদায়ী চেতনা। সঞ্জীবদা, আপনি অমর!
লেখক: কবি, গীতিকবি, কথাসাহিত্যিক

সঞ্জীব চৌধুরীকে নিয়ে আমি লিখতে চাইনি। কেন জানি না, তাঁর কথা ভাবতে গেলেই তাঁর গানের কথাই ঘুরেফিরে মনে আসে, ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন...?’ এমনিতেই আমার চোখে অনেক সমস্যা। আমি চশমা ছাড়া কোনো লেখা পড়তে পারি না। আর কলম দিয়ে লিখতে গেলে চশমা পরেও লিখতে পারি না। কারণ, লেখার সময় কাগজের যতটা কাছে চোখ চলে যায়, সেই দূরত্ব থেকে সব ঝাপসা দেখায়। বাঁচার কথা, এই লেখা আমি কাগজের ওপর কলম দিয়ে নয়, লিখছি সরাসরি কম্পিউটারের স্ক্রিনে।
আমি সঞ্জীব চৌধুরীর গান প্রথম শুনি দলছুট ব্যান্ডের অ্যালবামে, সেটা সম্ভবত এই ব্যান্ডের দ্বিতীয় অ্যালবাম। দ্বিতীয়টা শুনে এতটাই বিমোহিত হই যে, খুঁজে পেতে প্রথম অ্যালবামটি কিনে ফেলি। রাজশাহীর মতো ছোট শহরে তিন-চার বছর আগে রিলিজ হয়ে বিক্রি হয়ে যাওয়া অ্যালবাম সহজে পাওয়ার নয়। সে যাই হোক, দ্বিতীয় অ্যালবামের নাম ছিল সম্ভবত ‘হৃদয়পুর’, আর প্রথমটার ‘আহ্!’ আমার ভুলও হতে পারে। এখনই গুগলে সার্চ দিলেই সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে, কিন্তু আমার ইচ্ছে করছে না। থাকে যদি তো থাকুক কিছু ভুল।
সঞ্জীব চৌধুরীর গোটা জীবনটাই আমার কাছে ভুলে ভরা মনে হয়। মনে হয়, এক অমিত সম্ভাবনার অসামান্য আধারের অমার্জনীয় অপচয়। মনে হয়, অমৃত সুধায় কানায় কানায় ভরা একটি পাত্র কেউ পরিবেশন করলেন তাঁর খুব প্রিয় বন্ধুর কাছে, তারপর সেই বন্ধুটি পাত্রের জন্য হাত বাড়াতেই, কেন জানি না, তিনি নিজেই সে পাত্রটি উল্টে দিলেন। একেবারে উপুড় করা নয়, কাত করে ফেলে রাখলেন টেবিলের ওপর। অসামান্য সে পানীয় গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে, বেচারা বন্ধু আর কী করে, সেখান থেকেই চেটেপুটে খাচ্ছে, পাত্রের ভেতর এখনো সামান্য জমে আছে, সেটুকু কখন উপচে পড়বে আর কখন সে চেটে খেতে পারবে, তার অপেক্ষায় গভীর অনিশ্চয়তা নিয়ে বসে আছে। আমাদের অবস্থা হয়েছে সেই বন্ধুটির মতো।
আর পরিবেশনকারী স্বয়ং সঞ্জীব চৌধুরী, যিনি পাত্র উল্টে অপচয় করলেন নিজেরই জীবনের অনবদ্য অমৃত রস, অপার সম্ভাবনা। তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা আছে সম্ভবত ব্রেইন হেমারেজ, কিন্তু আমি জানি, সেটা আত্মহত্যা ছিল। একবার দুবারের চেষ্টায় নয়, দিনের পর দিন, দীর্ঘ পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত প্রয়াসে তিনি একটু একটু করে হত্যা করেছেন নিজেকে। কী কারণ, কিসের এত অভিমান, আমি তা জানি না। তবে অনুমান করতে পারি, তিনি ভুল সময়ে জন্মেছিলেন। আমার বন্ধু তানভীর চৌধুরী গান লিখেছিল, ‘এমন মরার দেশে/ ভুল করে চলে এসে/ অনেক কষ্ট নিয়ে/ রীতিমতো রেগে গিয়ে/ বহু আগে হেরে যাওয়া বেহিসেবি ঈশ্বর!’ সঞ্জীব চৌধুরী আমার কাছে এই ‘মরার দেশে ভুল করে চলে আসা’ এবং ‘বহু আগে হেরে যাওয়া বেহিসেবি ঈশ্বর’। অনেক আগে থেকেই হেরে যাওয়ার ব্যাপারটা তিনি জানতেন। জানতেন বলেই নিজেকে ধ্বংস করতে শুরু করে দিয়েছিলেন পুরোদমে। কারণ, মানতে পারতেন না যে তিনি হেরে গেছেন।
কর্মজীবনে পুরোদস্তুর সাংবাদিক ছিলেন। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের আধুনিক যুগে উত্তরণের সময়কালটায় ছিলেন পুরোভাগে। সাপ্তাহিক একতা, দৈনিক আজকের কাগজ, ভোরের কাগজে। বামধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। চোখের সামনে মার খেতে দেখেছেন, নিজেও মার খেয়েছেন, মরে যেতে দেখেছেন সহযোদ্ধা সহপাঠী, সহকর্মীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আদমজী পাটকল সবখানে এরশাদশাহির জুলুম-নিপীড়ন দেখেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, প্রতিরোধ করেছেন। রাজপথে ব্যারিকেডে দাঁড়িয়েছেন যেমন, তেমনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বরচিত গানে তীব্র প্রতিবাদের আগুন জ্বেলেছেন। ‘...আমার স্বপ্নের কথাগুলো বলতে চাই...’!
গণমানুষের মুক্তির গান, স্বপ্নের কথা তাঁর চেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে আর কে ছুড়ে দিয়েছে এমন সোচ্চারে? এত সাহস আর কার ছিল? আজ যখন ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু সাংবাদিক নামের কলঙ্ককে দেখি কোনো কোনো খুনে-শিল্পপতির তৈলচিত্র আঁকতে গিয়ে বলে, লোকটির সারা শরীরটাই কলিজা, তখন আমি হতভম্ব হয়ে যাই, আর আমার মনে পড়ে যায় সঞ্জীব চৌধুরীর কথা। সারা শরীরজুড়ে কলিজা যদি কারও থেকে থাকে, তো সেটা তাঁরই ছিল। আক্ষরিক অর্থেই ছিল। সত্যের সঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য তিনি বহুদূর পর্যন্ত যেতে পারতেন।
আজ যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন, তাই আজ বড়দিন। আজ সঞ্জীব দা’রও জন্মদিন, আজ দিনটা তাই সত্যিই বড়। তিনি নেই, দিনটা পড়ে আছে। আর পড়ে আছে তাঁর অসামান্য সৃষ্টি অসামান্য সব গান। আর স্ফুলিঙ্গের মতো উত্তুঙ্গ তাঁর জীবনবোধ ও প্রেরণাদায়ী চেতনা। সঞ্জীবদা, আপনি অমর!
লেখক: কবি, গীতিকবি, কথাসাহিত্যিক

রায়হান রাফীর ‘পরাণ’ সিনেমায় প্রথম জুটি বেঁধেছিলেন শরিফুল রাজ ও বিদ্যা সিনহা মিম। সিনেমার ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি প্রশংসিত হয় রাজ-মিম জুটির রসায়ন। এরপর একই নির্মাতার ‘দামাল’ সিনেমাতেও দেখা যায় তাঁদের।
২ ঘণ্টা আগে
২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। এ বছর তাঁর ১৮তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে নাট্যসংগঠন স্বপ্নদল ১৪ থেকে ১৬ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে আয়োজন করেছে তিন দিনব্যাপী নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন স্মরণোৎসব।
৩ ঘণ্টা আগে
রাজধানীর পাঁচটি মিলনায়তন এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী বিচ পয়েন্টে ১০ জানুয়ারি থেকে চলছে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। চলচ্চিত্র নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই আয়োজনে দেখানো হচ্ছে দেশ-বিদেশের নির্মাতাদের কাজ।
৩ ঘণ্টা আগে
তামিল সুপারস্টার থালাপতি বিজয় ‘জন নায়াগন’ দিয়ে শেষ করবেন অভিনয়ের ক্যারিয়ার। এরপর পাকাপাকিভাবে নামবেন রাজনীতির ময়দানে। এরই মধ্যে শুটিং শেষ, ৯ জানুয়ারি মুক্তির তারিখ চূড়ান্ত ছিল। ভক্তদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ ছিল বিজয়ের শেষ সিনেমা নিয়ে। তবে শেষ মুহূর্তে সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞায় আটকে যায় সিনেমাটি।
৩ ঘণ্টা আগে