Ajker Patrika

মেডিকেল ও আর্কিটেকচার ছেড়ে সিভিল জজ হলেন স্বর্ণা

‘মম, এমনভাবে পড়বে যেন পত্রিকায় আসে। পত্রিকায় না আসলে হবে না।’ ভাগনের এই কথাটিই ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন শায়লা পারভীন স্বর্ণা। ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থী। মেধাক্রমে তাঁর অবস্থান ২৮তম। তাঁর সাফল্যের গল্প শুনেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার।

শাহ বিলিয়া জুলফিকার
মেডিকেল ও আর্কিটেকচার ছেড়ে সিভিল জজ হলেন স্বর্ণা
শায়লা পারভীন স্বর্ণা। ছবি: সংগৃহীত

স্বর্ণার শিক্ষাজীবনের শুরু রতনদিয়া রজনীকান্ত উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেন।

আইনে ভর্তির আগে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আর্কিটেকচারে ভর্তি হয়েছিলেন স্বর্ণা। পরে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজেও ভর্তি হন। তবে কোথাও আগ্রহ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। এরপর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে ভর্তি হন। আইনের কয়েকটি ক্লাস করার পর বিষয়টির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং সেখানেই পড়াশোনা চালিয়ে যান।

শিক্ষাজীবনে বিচারক হওয়ার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না তাঁর। তবে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাঁর মা চাইতেন, মেয়ে বিচারক হোক। একাডেমিক জীবন শেষে ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধায় থাকার সময় মা তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমার খুব শখ, জজের মা হব।’ মায়ের সেই ইচ্ছাই পরে স্বর্ণার নিজের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। বিজেএসের প্রস্তুতির সময় সিভিল জজ কাজী নুসরাত আরিফ, বেলাল মুহাম্মদ, সাদিয়া আনজুম পূর্ণতাসহ অন্য বিচারকদের দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন।

প্রস্তুতির শুরু

১৭তম বিজেএসে মাত্র ০.২৫ নম্বরের জন্য প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি স্বর্ণা। এর আগে স্নাতক শেষ করার পর প্রস্তুতি ছাড়াই একবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। পরীক্ষার হলে গিয়ে ১০০টি প্রশ্নের মধ্যে মাত্র একটি প্রশ্ন পরিচিত মনে হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতার পর তিনি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পরিকল্পনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন।

এরপর ১৮তম বিজেএসকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রস্তুতির সময় তাঁর নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ভাগনে ফাইয়াদ একদিন তাঁকে বলেছিল, ‘মম, এমনভাবে পড়বা যেন পত্রিকায় আসে। পত্রিকায় না আসলে হবে না।’ কথাটি তাঁর প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলে। অঙ্কে দুর্বল হওয়ায় মাঝে মাঝে ভাগনে তাঁকে জ্যামিতিও বুঝিয়ে দিত।

বার কাউন্সিল পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় করা ‘সেভেন ল’-এর একটি নোটও বিজেএস প্রিলিমিনারিতে কাজে লাগান। আইন অংশের জন্য ওই নোটের পাশাপাশি ‘বিজেএস প্রিলি মাস্টার’ পড়েছেন। সাধারণ অংশের প্রস্তুতিতে বিসিএস ও বিজেএসের পূর্ববর্তী বছরের প্রিলিমিনারি প্রশ্ন ব্যাখ্যাসহ অনুশীলন করেছেন।

প্রিলি প্রস্তুতি

প্রিলিমিনারিতে আইনের ক্ষেত্রে তাঁর মূল ভরসা ছিল বার কাউন্সিলের সময় করা সেভেন ল-এর নোট এবং বিজেএস প্রিলি মাস্টার। জেনারেল অংশের জন্য তিনি বিসিএস ও বিজেএসের পূর্ববর্তী বছরের প্রিলি প্রশ্ন ব্যাখ্যাসহ পড়েছেন। শুরু থেকে তিনি সিলেবাস বুঝে পড়ার ওপর গুরুত্ব দেন এবং নিজের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে কাজ করেছেন।

লিখিত প্রস্তুতি

আইনের ক্ষেত্রে তাঁর রিটেন প্রস্তুতি ছিল ধারাভিত্তিক। প্রতিটি আইনের ধারা বুঝে, কি পয়েন্ট করে পড়তেন এবং প্রিভিয়াস ইয়ারের প্রশ্ন সলভ করেছেন। তাঁর মতে, রিটেনে পড়াশোনার পাশাপাশি লেখার অভ্যাস করাটা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জেনারেল পার্টের ক্ষেত্রে তাঁর প্রস্তুতির মূল অংশ ছিল বিসিএস এবং বিজেএসের প্রিভিয়াস রিটেন প্রশ্ন সলভ করা। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ইস্যুগুলো দেখেছেন।

ভাইভা প্রস্তুতি

ভাইভা প্রস্তুতি ছিল একটু ভিন্ন। মূলত নিজেকে শান্ত রাখা, মানসিকভাবে শক্ত থাকা এবং যা জানেন, তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা—এসবের ওপর বেশি ফোকাস করেছেন তিনি। ভাইভায় পড়াশোনার চেয়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস রেডি করা এবং নিজেকে শান্ত রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে তাঁর ভাইভাও খুব ভালো হয়েছিল।

নতুনদের জন্য পরামর্শ

নতুনদের উদ্দেশে স্বর্ণার পরামর্শ, প্রথমে নিজের আগ্রহ ও লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে হবে। অন্যের সাফল্যে প্রভাবিত না হয়ে নিজের সামর্থ্য ও আগ্রহ অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। এরপর সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর মতে, প্রস্তুতির সময় ব্যর্থতা ও হতাশা আসতে পারে। এগুলোকে সাময়িক বাধা হিসেবে নিয়ে আবার প্রস্তুতিতে ফিরে আসতে হবে। নিয়মিত পড়াশোনা, নিজের ভুল ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা এবং লক্ষ্যে স্থির থাকাই গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বিচার বিভাগে যোগ দিয়ে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে চান স্বর্ণা। একজন বিচারক হিসেবে আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতের চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি বিচারিক জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত পড়াশোনা ও আইনচর্চা চালিয়ে যেতে চান। ভবিষ্যতে দক্ষ ও মানবিক বিচারক হিসেবে দেশের বিচারব্যবস্থায় অবদান রাখাই তাঁর লক্ষ্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত