বিনা মূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তিসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমছে না। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক—শিক্ষার সব স্তরে প্রতিবছর বিপুল শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রতি তিনজনে একজন ঝরে যাচ্ছে। এ দুই স্তরে কারিগরি ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আরও বেশি। ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ঝরে পড়ছে বেশি। প্রাথমিক স্তরেও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ছাড়ার হার বেড়েছে।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৪ এবং বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পরিবারের আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সমস্যা, শিক্ষার মান ও শেখার আগ্রহ কমে যাওয়া, অভিভাবকদের অনাগ্রহ এবং মূল্যস্ফীতির কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ঝরে পড়া ঠেকাতে সরকার উপবৃত্তি ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা-মোজা দেওয়া এবং ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো, বড় পরিসরে স্কুল ফিডিং বা মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষায় খরচ কমানোর তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান স্তরে। এই স্তরে প্রতি তিনজনে একজনের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। এর হার ৩৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৪০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেছিল ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৯ জন। অর্থাৎ এসএসসি ও সমমান পাস করেও বাকি ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৫১ জন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়নি। অর্থাৎ একাদশে ভর্তির আগেই ঝরে পড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।
এর পরের ধাপে, অর্থাৎ একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেও এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৪ জন। যা নিবন্ধন করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ২১ দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থাৎ এসএসসি পাসের পর এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফরম পূরণের আগে ঝরে পড়েছে ৫ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৫ জন শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে। কারিগরি বোর্ডের এবারের এইচএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৩ জন। তবে পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে ৯৫ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ ৬৩ হাজার ৫২৫ জন বা ৩৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে ঝরে পড়েছে। মাদ্রাসা বোর্ডে আলিমে (এইচএসসি সমমান) নিবন্ধন করা ১ লাখ ২৮ হাজার ৭৫৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করে ৭৯ হাজার ৯ জন। অর্থাৎ ভর্তি হয়েও চলমান আলিম পরীক্ষা দিচ্ছে না ৪৯ হাজার ৭৫০ শিক্ষার্থী। এখানে ঝরে পড়ার হার ৩৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এইচএসসির জন্য নিবন্ধন করেছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন। তাদের মধ্যে পরীক্ষার ফরম পূরণ করে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন বা ৩৩ দশমিক ০৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এইচএসসি ও সমমানের স্তরে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ঝরে পড়ছে বেশি।
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার আগে প্রায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়া প্রসঙ্গে ওই পরীক্ষা শুরুর আগে গত ২ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘বিগত দিনের মতো প্রস্তুতি ছাড়া কেউ (পরীক্ষার হলে) যেতে পারছে না। সে জন্য বোধ হয় হার বেড়ে গেছে। কিন্তু এটি খুব খারাপ ইন্ডিকেটর (সূচক)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র বলেছে, নিবন্ধন করেও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা না দেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের মাধ্যমে একটি গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এবং শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়া শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। সরকার উপবৃত্তি, বই ও অন্যান্য সহায়তা দিলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এখনো অবৈতনিক নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ব্যানবেইসের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিকে ওঠার পর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী শিক্ষার ধারায় থাকেনি। মাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ৩০ দশমিক ৬৩ এবং মেয়েদের ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ১ লাখ ২ হাজার ১৫ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজ থেকে ঝরে পড়েছে। এর মধ্যে ৬২ হাজার ৩০৮ জন মেয়ে, যা মোট ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ০৮ শতাংশ।
জাতীয় সংসদে ১৪ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী জানান, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে সরকার বিনা মূল্যে চাররঙা পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং, স্কুল ড্রেস, জুতা-মোজা বিতরণসহ একগুচ্ছ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
প্রাথমিক স্তরেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেড়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান-২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ছিল ১৪ দশমিক ১২ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ১৯ দশমিক ০২ শতাংশ। ২০২৩ সালে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার ছিল ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতিজনিত আর্থিক চাপ এবং অল্প বয়সে শ্রমবাজারে প্রবেশসহ বিভিন্ন কারণে ঝরে পড়ার হার বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা ওপরের শ্রেণিতে উঠলে ঝরে পড়ার হার বাড়ে।
দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা মিলিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক স্তরে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি শিশু পড়াশোনা করছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, এটা ইতিবাচক। ঝরে পড়া রোধ না করতে পারলে এসডিজি অর্জন সম্ভব হবে না। সামগ্রিকভাবে দেশের অগ্রগতি হবে না।
একাধিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রধান কারণগুলো হলো পারিবারিক আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত ক্ষতি। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সমস্যা, শিক্ষার মান ও শেখার আগ্রহ কমে যাওয়া; অভিভাবকদের অনাগ্রহ এবং মূল্যস্ফীতিও ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ গতকাল রোববার রাজধানীতে ইউনিসেফ আয়োজিত এক কর্মশালায় বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া প্রসঙ্গে বলেন, শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেসসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

বিশ্ব ফুসফুস ক্যানসার দিবস ২০২৬ উপলক্ষে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) ফুসফুসের ক্যানসার সচেতনতা বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
৬ ঘণ্টা আগে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম আবর্তনের শিক্ষার্থী জয় সাহাকে বহিষ্কারসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন তাঁর সহপাঠীরা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা...
৮ ঘণ্টা আগে
ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের বিএসসি ইন ইইই প্রোগ্রামের আইইবি-বিএইটিই (ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড-স্বীকৃত) অ্যাক্রেডিটেশন তৃতীয়বারের মতো নবায়ন হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা
৯ ঘণ্টা আগে
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক ও সৃজনশীল করে গড়ে তুলতে প্রাথমিকের কারিকুলামে ‘সায়েন্স টয়’ যুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই, শিশুরা শুধু বই পড়ে বিজ্ঞান শিখবে না, বরং হাতে-কলমে কাজ করে, খেলতে খেলতেই বিজ্ঞান...
১৪ ঘণ্টা আগে