Ajker Patrika

বিশ্বমঞ্চে তিন তরুণের উদ্ভাবন ‘আকাশ পাঠাব’ দল

আনিসুল ইসলাম নাঈম
বিশ্বমঞ্চে তিন তরুণের উদ্ভাবন ‘আকাশ পাঠাব’ দল
আবিদুর রহমান, মুহতাসিম রহমান ভূঁইয়া ও সাফওয়ান সাদাত।

তিনজন শিক্ষার্থী মিলে একটি রোভার দল গঠন করেছেন। নাম ‘আকাশ পাঠাব’। ১৬ থেকে ১৭ মে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠেয় কোডাভ্যার ইন্টারন্যাশনাল ৭.০ প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে দলটি। বিশ্বের ৭০টি দেশের প্রায় ১০ হাজার উদ্ভাবকের অংশগ্রহণে বসবে আয়োজিত আসরটি। ‘আকাশ পাঠাব’ দলটি দুর্যোগ মোকাবিলা ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি একটি বহুমুখী রোভার উপস্থাপন করবে। তিনজনের মধ্যে দলপ্রধান গ্রিনল্যান্ড রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী সাফওয়ান সাদাত, মেকানিক্যাল লিড এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মুহতাসিম রহমান ভূঁইয়া, প্রোগ্রামিং ও সেফটি অফিসার হিসেবে আবিদুর রহমান দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁদের পথচলার গল্প নিয়ে লিখেছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম।

দলটি যেভাবে এসেছে

দলপ্রধান সাফওয়ান সাদাতের সঙ্গে মুহতাসিমের পরিচয় হয় ২০২৪ সালে দুবাইয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে। সেই ইভেন্ট থেকে দুজনের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর থেকে তাঁদের একসঙ্গে কাজ শুরুর পথচলা। একসময় তাঁদের দলে যোগ দেন আবিদ। পর্যায়ক্রমে তিনজন একটি ডেডিকেটেড টিম হিসেবে উন্নতি করতে থাকেন। তাঁদের মূল ফোকাস সব সময় রোবোটিকস হলেও এর বাইরে তাঁরা সৃজনশীলতা ও নিজেদের এক্সপ্লোর করে থাকেন। দলপ্রধান সাফওয়ান সাদাত ব্যক্তিগতভাবে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত এবং বিশেষভাবে ‘অ্যাভয়েডরাফা’র গানের বড় ভক্ত। তাঁর গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তাঁদের টিমের নাম রাখা হয় ‘আকাশ পাঠাব’।

‘আকাশ পাঠাব’ রোভারটির শুরুর গল্প

ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নাসা) কার্যক্রমগুলো দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁদের রোভার প্রকল্পের যাত্রা শুরু। দলপ্রধান সাফওয়ান সাদাত ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতেন নাসায় কাজ করার। সেই স্বপ্ন থেকে রোভার নিয়ে তাঁর আগ্রহ বাড়ে। এরপর ২০২১ সাল থেকে শুরু করেন রোভার বানানো। এরপর বেসিক লেভেল থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে অ্যাডভান্সড সিস্টেমস; যেমন সেন্সর ইন্টিগ্রেশন, অটোনোমাস নেভিগেশন এবং ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন নিয়ে কাজ করতে থাকেন। এ সময় ‘আকাশ পাঠাব’ রোভারটি তৈরি করেন। দলটি চেষ্টায় আছে ব্যতিক্রম কিছু করার, যা বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তাঁদের সবার মধ্যে বোঝাপড়া, কো-অর্ডিনেশন এবং টিমওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী। তাঁরা খুব দ্রুত আইডিয়া শেয়ার করতে পারে এবং সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। শক্তিশালী টিম বন্ডিংই তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার বড় শক্তি।

রোভারটির কাজ কী

এটির প্রধান প্রকল্প হলো এথ্রিপিফাইভ রোভার, যা একটি মাল্টিপারপাস ইন্টেলিজেন্ট রোভার সিস্টেম। একে প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমান রোবট গাড়ি বলা হয়, যা একাই বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে পারে। এর রয়েছে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের সাহায্য ছাড়াই কাজ করার সক্ষমতা। এটি মূলত ডিজাস্টার রেসপন্স, এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং এবং রিমোট এক্সপ্লোরেশনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। রোভারটিতে ইনডিপেনডেন্ট স্টিয়ারিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রতিটি চাকা আলাদাভাবে কন্ট্রোল করা যায়। এটি প্রিসাইজ মুভমেন্ট কিংবা সরু বা সংকীর্ণ জায়গায় কৌশলে সহজে কাজ করে। এতে রয়েছে ডুয়েল কন্ট্রোল সিস্টেমস, যা FlySky i6s রিমোট ব্যবহার করে রোভারটিকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এতে দুটি রোবোটিক আর্ম রয়েছে। অবজেক্ট পিক (কোনো জিনিস খুঁজে সেটিকে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা) করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সেন্সর (গ্যাস, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, মাটি, আগুন, আর্দ্রতা) ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক ডেটা সংগ্রহ করে থাকে। এই ডেটাগুলো ল্যাপটপ/সার্ভার ড্যাশবোর্ডে স্লো হয়, যা অ্যাডভান্সড মনিটরিং সিস্টেমসের মতো কাজ করে। এ ছাড়া এতে লাইভ ক্যামেরা সিস্টেমস রয়েছে, যার মাধ্যমে রিমোর্ট নেভিগেশন ও মনিটরিং সহজ হয়। এটি আরডুইনো-বেসড সিস্টেম হওয়ায় ভবিষ্যতে এআইভিত্তিক অটোমেশন যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন জায়গায় রোভারটি কাজ করতে পারবে। বিষাক্ত পরিবেশ, অগ্নিবলয় এবং দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোতে টিকে থাকার সক্ষমতা রয়েছে রোবটটির।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দলটি

কোড্যাভার একটি আন্তর্জাতিক রোবোটিকস ও ইনোভেশন কম্পিটিশন, যা প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়। দলপ্রধান সাফওয়ান সাদাত ২০২৪ সালে দুবাইয়ে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পান। এ ছাড়া প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট করে উপস্থাপন করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার কৌশল রপ্ত করেন। সেই ধারাবাহিকতা থেকে আকাশ পাঠাব দলটি এবারের ইন্দোনেশিয়ার আসরে যাবে। এবার তাদের লক্ষ্য আরও অনেক বড় পরিসরে নিজেদের প্রমাণ করা।

স্পন্সরশিপ পেতে সহযোগিতা করায় তাদের বড়ভাই ক্রিপটিক ফেইট ব্র্যান্ডের গিটারিস্ট ফারহান সামাদকে কৃতজ্ঞতা জানান দলটি। তাঁর সহযোগিতা, দিকনির্দেশনা এবং কানেকশন ছাড়া সুযোগগুলো পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে যেত তাদের।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যতে রোবোটিকস, এআই এবং স্পেস টেকনোলজি নিয়ে আরও অ্যাডভান্সড প্রজেক্ট ডেভেলপ করার স্বপ্ন রয়েছে দলটির। তাদের লক্ষ্য শুধু প্রতিযোগিতায় জেতা নয়; বরং এমন কিছু তৈরি করবে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লাল-সবুজের পতাকাকে প্রতিনিধিত্ব করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত