Ajker Patrika

পাঠকবন্ধুর বর্ষ সমাপন উৎসব: বিদায়ের আলোয় নতুনের গান

তাওহিদ আহমেদ সালেহীন
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ৫৭
পাঠকবন্ধুর বর্ষ সমাপন উৎসব: বিদায়ের আলোয় নতুনের গান
পাঠকবন্ধুর বর্ষসমাপন উৎসব। ছবি: পাঠকবন্ধু

বছর যায়, বছর আসে। সময় তার নিজস্ব গতিতে চলে। আর আমাদের জীবন থেকে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে একেকটি দিন, একেকটি মুহূর্ত। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনকে বরণ করাই যেন সবার চিরচেনা অভ্যাস। বৈশাখ এলেই তাই চারপাশে লাল-সাদার রঙিন ছটা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, মঙ্গল শোভাযাত্রার উচ্ছ্বাস আর বৈশাখী মেলার কোলাহল। সব মিলিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এক বর্ণিল উৎসব।

তবে এই চেনা রীতির বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক আয়োজনে মাতে পাঠকবন্ধু গণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। নতুন বছরকে বরণ করার চেয়ে পুরোনো বছরকে স্মরণ করে বিদায় জানানোর মধ্যেই তারা খুঁজে নেয় অন্য রকম এক সৌন্দর্য।

ছোট্ট এক সভা থেকে এই ভাবনার সূত্রপাত। কীভাবে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো যায়—এ নিয়ে যখন কথা হচ্ছিল, তখন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা আফরিন সূচনা একটি ব্যতিক্রমী প্রস্তাব করেন, ‘সবাই তো নতুন বছরকে বরণ করে, আমরা যদি উৎসবমুখর পরিবেশে পুরোনো বছরকে বিদায় জানাই?’ কেমন হয়? প্রস্তাবটি সবার মন ছুঁয়ে যায়। সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ঠিক হয়, উৎসব হবে, তবে তা হবে বিদায়ের।

পাঠকবন্ধুর বর্ষসমাপন উৎসব। ছবি: পাঠকবন্ধু
পাঠকবন্ধুর বর্ষসমাপন উৎসব। ছবি: পাঠকবন্ধু

সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ১৩ এপ্রিল আয়োজিত হয় ‘পাঠকবন্ধু বর্ষ সমাপন উৎসব ১৪৩২ বঙ্গাব্দ’। ‘পুরোনো বছর স্মৃতির খাতা, নতুন বছরে স্বপ্নের কথা’—এই স্লোগানে বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় দিনব্যাপী আয়োজন।

উৎসবের সূচনা হয় চিত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। পাঠকবন্ধুর সদস্যরা নিজেদের হাতে আঁকা ছবিতে তুলে ধরেন একটি বছরের গল্প—কখনো তা ব্যক্তিগত অনুভব, কখনো সমাজ বা সময়ের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি ক্যানভাস যেন একেকটি স্মৃতির খাতা, যেখানে ধরা পড়ে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব।

ক্রমেই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণে উৎসবটি হয়ে ওঠে এক আন্তরিক মিলনমেলা। ভিড় বাড়লেও আয়োজনের উষ্ণতা ও ঘনিষ্ঠতা ছিল স্পষ্ট।

পাঠকবন্ধুর বর্ষসমাপন উৎসব। ছবি: পাঠকবন্ধু
পাঠকবন্ধুর বর্ষসমাপন উৎসব। ছবি: পাঠকবন্ধু

চিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পর বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হোসেন বলেন, ‘বিদায় শব্দের সঙ্গে দুঃখ-বেদনা জড়িয়ে থাকলেও এই বিদায় উৎসব নতুন বছরকে বরণ করারই প্রস্তুতি। একই সঙ্গে বিগত বছরের অপ্রাপ্তিগুলো উপলব্ধি করে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা এখানে রয়েছে। শিক্ষার্থীদের এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।’

একই সুর শোনা যায় আরেক শিক্ষিকা সারমিন সুলতানা রাখির কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘পাঠকবন্ধুর এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিভা প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমরা নতুন বছরকে স্বাগত জানাই, কিন্তু চলতি বছরকে সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়ার চর্চা খুব কম। তোমরা সেটি মনে রেখেছ—এটাই সবচেয়ে ভালো লেগেছে।’

চিত্র প্রদর্শনীর এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজের আঁকা ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন রসায়ন বিভাগের ২৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রিফা। তিনি বলেন, ‘বর্ষবিদায় মানে আমার কাছে পুরোনোকে পেছনে রেখে এগিয়ে যাওয়া। আমার ছবিতেও সেই কথাটাই বলতে চেয়েছি। নতুন বছর মানে আমার কাছে নতুন কিছু বই, নতুন স্বপ্ন, পুরোনো দুঃখ ভুলে আবার নতুন করে বাঁচা।’

অতিথিদের আপ্যায়নে ছিল মিষ্টিজাতীয় খাবার। বিকেলের দিকে উৎসবের আবহে যুক্ত হয় গান, কোথাও ভেসে আসে ‘মনে পড়ে রুবি রায়’, কোথাও ‘আসমানে যাইয়ো না রে বন্ধু’। একসময় সুর মিশে যায় সবার কণ্ঠে, আর পুরো আয়োজন রূপ নেয় এক অনানুষ্ঠানিক আনন্দমেলায়।

এদিকে মেয়েদের অংশগ্রহণে আয়োজিত মেহেদি উৎসব যুক্ত করে বাড়তি রং। হাতে হাতে আঁকা নকশায় ধরা পড়ে স্মৃতির ছাপ, বন্ধুত্বের উচ্ছ্বাস আর উৎসবের আবেগ।

দিন শেষে আলো নিভে এলেও থেকে যায় এক গভীর অনুভূতি। পুরোনোকে বিদায় দেওয়া মানে তাকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই নতুনের পথে এগিয়ে যাওয়া।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত