Ajker Patrika

ইতালিতে বৃত্তিসহ উচ্চশিক্ষার আদ্যোপান্ত

সাব্বির হোসেন
ইতালিতে বৃত্তিসহ উচ্চশিক্ষার আদ্যোপান্ত
ছবি: এআই

ইউরোপের দেশ ইতালির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিৎজা, কলোসিয়াম, রেনেসাঁর শিল্পকলা এবং ভূমধ্যসাগরের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য। তবে বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে ইতালি শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয়; বরং বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।

ভাবুন তো, অনেক ক্ষেত্রে টিউশন ফি সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ মওকুফ, সঙ্গে আবাসন ও অন্যান্য আর্থিক সহায়তা। অনেক অঞ্চলে ক্যানটিনে বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে খাবারের সুবিধা। পাশাপাশি ব্যক্তিগত খরচের জন্য বছরে প্রায় সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার ইউরো ভাতা পাওয়ার সুযোগ থাকে। ইতালির আঞ্চলিক বৃত্তি (ডিএসইউ) অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করছে।

তবে সুযোগ যত আকর্ষণীয়ই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন থেকে শুরু করে ভিসা পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে জটিল মনে হয়। তাই ইতালিতে উচ্চশিক্ষার পুরো পথচলাটি সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

আবেদনের উপযুক্ত সময়

ইতালির বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেপ্টেম্বর বা শরৎকালীন সেশনকে কেন্দ্র করেই ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেব্রুয়ারি বা বসন্তকালীন সেশনে ভর্তি নেওয়া হলেও আসন তুলনামূলক কম। তাই আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে নজর রাখা দরকার।

  • বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন: সাধারণত নভেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে।
  • প্রাক্-ভর্তি নিবন্ধন: সাধারণত এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে।
  • ভিসার আবেদন: সাধারণত জুন থেকে আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে।

ভর্তির যোগ্যতা

ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ সহনশীল হলেও কিছু ন্যূনতম যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।

  • স্নাতক পর্যায়: এইচএসসি, ডিপ্লোমা বা এ-লেভেলসহ মোট ১২ বছরের শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হতে হবে। জিপিএ ৫-এর মধ্যে ৩.৫০ বা তার বেশি থাকলে ভালো। প্রকৌশল, অর্থনীতি বা সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে টিওএলসি-এফ, টিওএলসি-ই অথবা এসএটি পরীক্ষার ফলাফল প্রয়োজন হতে পারে।
  • স্নাতকোত্তর পর্যায়: সমমানের স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয়। সাধারণত সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ২.৭৫ বা তার বেশি চাওয়া হলেও শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৩.০০ বা তার বেশি থাকলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা যায়।

ভাষাগত যোগ্যতা

অনেক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন, আইইএলটিএস ছাড়া কি ইতালিতে পড়াশোনা সম্ভব? উত্তর হলো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভব। যদি পূর্ববর্তী ডিগ্রি ইংরেজি মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন (এমওআই)’ সনদ দিয়ে আবেদন করা যায়। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয় এমওআই গ্রহণ করে না। তাই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নীতিমালা আগে থেকে দেখে নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে আইইএলটিএসে ৬.০-৬.৫ ব্যান্ড স্কোর থাকলে ভাষাগত দক্ষতা প্রমাণ করা সহজ হয় এবং ভিসা প্রক্রিয়াতেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

আঞ্চলিক বৃত্তি ও সুবিধা

ইতালিতে উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো আঞ্চলিক বৃত্তি বা ডিএসইউ। এই বৃত্তি কেবল শিক্ষাগত মেধার ভিত্তিতে নয়, আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতেও দেওয়া হয়। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ISEE Parificato জমা দিতে পারলে বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অঞ্চল ও বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে সুবিধার ধরন কিছুটা ভিন্ন হলেও সাধারণত পাওয়া যায়

  • টিউশন ফি সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ মওকুফ।
  • বছরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ইউরো পর্যন্ত ভাতা।
  • আবাসনের সুযোগ অথবা আবাসন-সংক্রান্ত সহায়তা।
  • ক্যানটিনে বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে খাবারের সুবিধা।

আবেদন প্রক্রিয়ার চার ধাপ

পুরো আবেদন প্রক্রিয়াটি চারটি ধাপে সম্পন্ন করা যায়। পর্যাপ্ত তথ্য জেনে এবং সময়মতো প্রস্তুতি নিলে অনেক শিক্ষার্থী নিজ উদ্যোগেও পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

১. বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন: পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খুলে আবেদন করতে হবে। অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন বিনা মূল্যে করা যায়, আবার কোথাও ২০ থেকে ৬০ ইউরো পর্যন্ত আবেদন ফি রয়েছে।

২. ইউনিভার্সইতালি পোর্টালে প্রাক্-ভর্তি নিবন্ধন: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর ইউনিভার্সইতালি পোর্টালে প্রাক্-ভর্তি নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়।

৩. একাডেমিক সমতা সনদ: বাংলাদেশের শিক্ষাগত সনদের সমমান যাচাইয়ের জন্য বর্তমানে সিমিয়া-এর স্টেটমেন্ট অব কমপ্যারেবিলিটি বহুল ব্যবহৃত। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইতালীয় দূতাবাস থেকে ডিক্লারেশন অব ভ্যালুও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কোনটি প্রয়োজন হবে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

৪. ভিসার আবেদন: ইউনিভার্সইতালি থেকে প্রাক্-ভর্তি অনুমোদনের সারসংক্ষেপ সংগ্রহ করে ঢাকার ভিএফএস ইতালি ভিসা আবেদনকেন্দ্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সাক্ষাৎকার ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়।

স্পনসরশিপ ও প্রাথমিক ব্যয়

বৃত্তি পেলেও শুরুতে কিছু ব্যয় নিজেকে বহন করতে হয়। স্টুডেন্ট ভিসার জন্য ইতালির নির্ধারিত ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়ের সমপরিমাণ আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে হয়। এ জন্য বাবা, মা অথবা আপন ভাই-বোনের স্পনসরশিপে ব্যাংক হিসাবে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদর্শন করা হয়। অর্থের উৎস অবশ্যই বৈধ হতে হবে এবং প্রয়োজনে বেতনের সনদ, আয়কর রিটার্ন বা ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রাসঙ্গিক নথি জমা দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন, নোটারি, সিমিয়া ফি (যদি প্রয়োজন হয়), ভিসা এবং বিমানভাড়া মিলিয়ে দেশ থেকে যাওয়ার আগে সাধারণত দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। ইতালিতে পৌঁছানোর পর বৃত্তির প্রথম কিস্তি হাতে পেতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তাই প্রাথমিক ব্যক্তিগত খরচের জন্য অতিরিক্ত অর্থ সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

ইতালিতে উচ্চশিক্ষার পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধৈর্য ধরে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা। সময়মতো আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করলে পুরো যাত্রা অনেক সহজ হয়ে যায়।

পাসপোর্ট, এসওপি, ইউরোপীয় মানের জীবনবৃত্তান্ত, সুপারিশপত্রসহ প্রয়োজনীয় নথি যত যত্নের সঙ্গে প্রস্তুত করা যাবে, ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত