Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষা দিবস: ইংরেজি শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণ

এ কে এম ইকবাল বাহার
আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষা দিবস: ইংরেজি শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণ

আজ ২৩ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষা দিবস। এ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির অপরিহার্যতা। শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাশিক্ষা এখন আর বিকল্প নয়, বরং প্রায় অবধারিত একটি প্রয়োজন। বাংলাদেশের নার্সিং শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবে এখানে কিছু নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যা সাধারণ ইংরেজি শিক্ষার সমস্যার চেয়ে আলাদা।

বর্তমান অবস্থা: বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষা ‘ডিপ্লোমা’ ও ‘বিএসসি’ উভয় স্তরে ইংরেজি ভাষার অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কারিকুলামে যে ইংরেজি শেখানো হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে কর্মজীবনের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পেশাগত জীবনে গিয়ে যোগাযোগগত সমস্যার মুখোমুখি হন।

অনেকে মনে করেন, সাধারণ ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শিখলে নার্সদের জন্য যথেষ্ট। দৈনন্দিন পরিচিতি, বাজারে কথাবার্তা বা সাধারণ সামাজিক ইংরেজি জানা থাকলেই চলবে—এমন ধারণা প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবে নার্সিং একটি বিশেষায়িত পেশা, যেখানে প্রয়োজন নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটভিত্তিক ইংরেজি দক্ষতা।

সংকটের গভীরতা: নার্সিং শিক্ষার্থীরা সাধারণত ১৮ বছর বয়সের পর উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করেন। এ পর্যায়ে ভাষার মৌলিক শেখার সময় পেরিয়ে আসে। তাই তাঁদের জন্য প্রয়োজন ‘ইংলিশ ফর স্পেসিফিক পারপাসেস (ইএসপি)’ অর্থাৎ পেশাভিত্তিক ইংরেজি।

নার্সিং শিক্ষায় ইএসপি অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা হাসপাতালভিত্তিক বাস্তব পরিস্থিতিতে ইংরেজি ব্যবহার করতে পারবেন। যেমন রোগীর সঙ্গে পরিচয়, উপসর্গ সম্পর্কে প্রশ্ন করা, চিকিৎসা ব্যাখ্যা দেওয়া, ওষুধ ও সেবার তথ্য আদান-প্রদান, ভর্তি থেকে ছাড়পত্র পর্যন্ত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা ইত্যাদি। এ ছাড়া ‘থেরাপিউটিক কমিউনিকেশন স্কিল’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, রাগান্বিত বা মুমূর্ষু রোগীর সঙ্গে কীভাবে মানবিক ও পেশাদারভাবে যোগাযোগ করতে হবে—এ বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এ জন্য রোল-প্লে, সিমুলেশন ও কেস-ভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।

সংকটের কারণসমূহ: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় চারটি মৌলিক দক্ষতা লিসেনিং, স্পিকিং, রিডিং ও রাইটিং যথাযথভাবে বিকশিত হচ্ছে না। তাই কারিকুলামে কমিউনিকেটিভ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং (সিএলটি) বাস্তবভাবে প্রয়োগ করা জরুরি, শুধু নথিতে নয়, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

মূল্যায়নব্যবস্থায়ও পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রচলিত নম্বরভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে রুব্রিক-ভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের (যেমন আইইএলটিএস) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত যোগাযোগ দক্ষতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষার্থীরা বাংলায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, এটি স্বাভাবিক। তাই একটি ‘বাইলিংগুয়াল অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাংলায় ধারণা বুঝবে এবং ইংরেজিতে তা প্রকাশ করতে শিখবে। এতে শেখা সহজ ও কার্যকর হবে।

অন্যদিকে, মানসম্মত পাঠ্যবইয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা। বাজারে প্রচলিত অনেক গাইড বইয়ে ভুল ও দুর্বল ইংরেজি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে। প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক, মানসম্মত ও ভাষাগতভাবে নির্ভুল পাঠ্যবই তৈরি এখন সময়ের দাবি।

পেশাগত প্রভাব: দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যাঁরা ক্লাসরুমে ইংরেজি পড়ান, তাঁদের অনেক সময় কারিকুলাম প্রণয়নে সম্পৃক্ত করা হয় না। এমনকি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মূল্যায়নেও অনেক ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে অপ্রাসঙ্গিক জনবল যুক্ত করা হয়, যা মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

উত্তরণের উপায়: এ পরিস্থিতিতে Applied Linguistics, ELT বা TESOL-এ প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত যুক্ত করা জরুরি। তাঁদের অভিজ্ঞতাই বাস্তবসম্মত ভাষাশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নার্সিং একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। ইংরেজি দক্ষতা শুধু শিক্ষাগত নয়, বরং কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক সুযোগের দ্বারও খুলে দেয়। তাই নার্সিং শিক্ষায় ইংরেজি ভাষাশিক্ষার সামগ্রিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এই সংস্কারে নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, ভাষাবিদ ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণই পারে একটি কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক পরিবর্তন আনতে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কেপিজে নার্সিং কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত