
সন্ধ্যার দিকে বেজে উঠল নাজাকাত আলীর ফোন। ভারত শাসিত কাশ্মীরে পর্যটক গাইড হিসেবে কাজ করেন এই ৩০ বছর বয়সী যুবক। বললেন, আজকাল প্রায়ই এমনটা হয়। কল আসে প্রায় প্রতিদিনই। ফোন ধরলেন, জানালেন, পরিস্থিতি এখন নিরাপদ। নিশ্চিন্তে আসতে পারেন পর্যটকেরা। আরও বললেন, তিনি অপেক্ষায় থাকবেন। ফোন রেখে জানালেন, হিমালয়ের এই মনোরম পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণে আসতে ইচ্ছুক পর্যটকের ফোন।
এক বছর আগে পেহেলগামে এক হামলায় ২৬ জন নিহত হন। কয়েক দশকের মধ্যে কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হওয়া অন্যতম বড় এই হামলার পর ওই অঞ্চলের পর্যটননির্ভর অর্থনীতি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
নাজাকাত বলতে থাকেন, ‘মানুষের মনে অনেক আতঙ্ক। বছর পেরিয়ে গেছে। এখন সবকিছু ঠিক আছে বলে তাঁদের আশ্বস্ত করতে হচ্ছে।’

হামলার পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে কর্তৃপক্ষ ওই অঞ্চলের ৮৭টি পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে ৪৮টি বন্ধ করে দেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কাশ্মীরে পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লাখ, যা ২০২৫ সালে আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১২ লাখের নিচে নেমে আসে। এরপর কিছু পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হলেও যেখানে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল সেই বাইসারান তৃণভূমি এলাকাটি এখনো বন্ধ রাখা হয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই পুরো কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করে। কয়েক দশকের সহিংসতায় সেখানে হাজার হাজার প্রাণ গেছে।
পেহেলগামের হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চার দিনব্যাপী সামরিক সংঘাত শুরু হয়। দিল্লি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানভিত্তিক একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। চার দিন পর দুই দেশ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
কাশ্মীরের অন্যান্য স্থানে পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হলেও এক সময়ের ব্যস্ততম পর্যটন কেন্দ্র পেহেলগাম পর্যটকদের ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে। গত বছরের হামলার আগে জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত পেহেলগামে পর্যটক এসেছিলেন ৪ লাখ ৬৯ হাজারের বেশি। এ বছর একই সময়ে পর্যটকের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজারে।
পর্যটক কমে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। হামলার মাত্র চার মাস আগে ২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবু বকর ২০ লাখ রুপি বিনিয়োগ করে একটি হোটেল খুলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এপ্রিলের পর থেকে আমরা প্রায় কিছুই আয় করতে পারিনি।’ লোকসানের কারণে শেষ পর্যন্ত ব্যবসাটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে তাঁর।
এই হামলার প্রভাব কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
হত্যাকাণ্ডের পর পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ও নিন্দা জানানো হয়। এরপর নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রায় ৩ হাজার তরুণকে আটক করা হয় এবং কিছু এলাকায় সন্দেহভাজন উগ্রবাদী অভিযোগে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে হামলার রেশ সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে।
কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, কিন্তু পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। পর্যটকরা আদৌ আগের মতো ফিরবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পেহেলগামের ‘পনি রাইডার অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রধান আব্দুল ওয়াহিদ ভাট বলেন, ‘আমরা আগেও কঠিন সময় দেখেছি। কিন্তু এই হামলাটি আলাদা। এটি পর্যটকদের কাছে খুব নেতিবাচক একটি বার্তা পাঠিয়েছে।’
বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরের সংঘাত একটি নির্দিষ্ট চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। কখনও বিক্ষোভ ও সহিংসতা, এরপর আবার সব স্বাভাবিক হতে শুরু করা। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই পর্যটন শিল্প তার নিজের জায়গা করে নিয়েছিল। এমনকি উত্তাল দিনগুলোতেও পাইন বন আর তৃণভূমির জন্য পরিচিত পেহেলগাম সরাসরি সংঘাত থেকে অনেকটা মুক্ত ছিল। গত বছরের এপ্রিলের হামলাটি সেই ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পর্যটকদের লক্ষ্য করে এই হামলা জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলেছে। এই পরিবর্তন এখন পেহেলগামের প্রতিদিনের দৃশ্যে স্পষ্ট।
সকালে পাইন বনের ঢালে হালকা রোদের ঝিলিক আর উপত্যকার বুক চিরে বয়ে চলা শান্ত নদী, সবই আগের মতো আছে। কিন্তু দিনের ব্যস্ততা বদলে গেছে।
গাইডরা রাস্তার ধারে কাজের আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন, কিন্তু কাজ সবসময় মেলে না। বিকেলের দিকে পর্যটকদের ছোট ছোট দল আসে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা খুব দ্রুত ছবি তুলে চলে যান। সন্ধ্যায় শহরটি প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়, পর্যটকদের খুব কম অংশই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন।
যেসব হোটেল এক সময় পর্যটকে ঠাসা থাকত, এখন তার প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে থাকে। পেহেলগাম হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান মুশতাক আহমেদ মাগরে বলেন, ‘গত বছর আমার লক্ষ্য ছিল ২ কোটি রুপি আয় করার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৫ লাখ রুপি আয় হয়েছে।’

তৃণভূমি থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। মানুষ সেখানে ফুল দেয়। কেউ কেউ নিহতদের নামগুলো পড়েন, তারপর দ্রুতই স্থান ত্যাগ করেন। তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করে যে সেখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে কি না।
নাজাকাত আলীর মতো গাইডদের জন্য এই উদ্বেগ এখন পেশার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি ফোন কল ধরলে তাঁকে হিসাব করে কথা বলতে হয়। নাজাকাত বলেন, ‘প্রকৃতিতে কিছুই বদলায়নি, তবুও জায়গাটা আগের মতো মনে হয় না।’
কাশ্মীরকে একটি স্থিতিশীল ও পর্যটনবান্ধব অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচেষ্টাও এই হামলার কারণে বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর সেখানে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল এবং পর্যটনও থমকে গিয়েছিল। পরে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বড় বড় আয়োজনের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল।
কর্মকর্তারা এখন দাবি করছেন, পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সহিংসতা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কাশ্মীরের পর্যটন পরিচালক সৈয়দ কামার সাজ্জাদ নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না দিলেও বলেছেন যে পেহেলগামে পর্যটক আসছেন এবং মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি।
কেরালা থেকে আসা পর্যটক কিরণ রাও বলেন, ‘আসার আগে ভয় কাজ করছিল, তবে এখানে এসে ভালো লাগছে।’
কিন্তু কাশ্মীরের অনেকের জন্যই গত বছরের স্মৃতি ভুলে যাওয়া সহজ নয়। ঘোড় সওয়ারি রইস আহমেদ ভাট বলেন, ‘চারদিকে লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। মানুষের কান্নার আওয়াজ এখনো আমার কানে বাজে।’
এই মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন বলে জানান তিনি।
আবার সৈয়দ হায়দার শাহের মতো অনেকে স্বজন হারিয়েছেন। তাঁর ছেলে আদিল ছিলেন একজন পনি রাইডার, যিনি পর্যটকদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজের প্রাণ দিয়েছিলেন। শাহ বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন তাঁকে মিস করি, তবে ছেলের জন্য আমরা গর্বিত।’
অন্যদিকে হামলার প্রভাব ভিন্নভাবে পড়েছে আব্দুল রশিদের মতো মানুষের ওপর। পুলওয়ামা জেলার এই বাসিন্দা গত এক বছর ধরে অস্থায়ী ছাউনিতে থাকছেন। হামলার কয়েক দিন পর উগ্রবাদবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে তাঁর ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। রশিদের ছেলে গত বছর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, উগ্রবাদ দমনে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়, কিন্তু সমালোচকরা একে বলছেন ‘সামষ্টিক শাস্তি’। রশিদের প্রশ্ন, ‘কেউ যদি অপরাধ করে থাকে, তবে তাঁর পরিবার কেন শাস্তি পাবে?’
পেহেলগামে নাজাকাত আলী এখনো তার ফোনে পর্যটকদের অভয় দিয়ে চলেছেন। এক ফাঁকে বিষণ্ণ স্বরে বললেন, ‘জায়গাটা অভিশপ্ত মনে হয়।’
এর মধ্যেই আবার তাঁর ফোন বেজে ওঠে, তিনি আবারও পর্যটককে আশ্বস্ত করা শুরু করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে নৈশভোজ অনুষ্ঠানে গুলির শব্দ শোনার পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আলোচনায় এসেছেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। ঘটনাটি ঘটেছে হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সহ সেখানে আরও অনেক উচ্চপর্যায়ের অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
১৯ মিনিট আগে
আফ্রিকার দেশ মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল সাদিও কামারা একটি সমন্বিত সশস্ত্র হামলার মধ্যে নিহত হয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় একযোগে চালানো হামলার প্রেক্ষাপটে এই মৃত্যুকে সামরিক সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১ ঘণ্টা আগে
সংঘাত-জর্জরিত গাজায় আশার আলো জ্বালাতে একটি গণবিয়ে আয়োজন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত ওই বিয়েতে একসঙ্গে ৩০০ জুটির বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজনটি ছিল মানবিক সহায়তা কর্মসূচি ‘গালান্ত নাইট ৩ ’-এর অংশ। এটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ফাউন্ডেশন।
১ ঘণ্টা আগে
ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত ভেনেজুয়েলা সরকার যেন নিউইয়র্ক সিটিতে মাদক পাচারের অভিযোগে ফেডারেল বিচারের মুখোমুখি প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর আইনি খরচ বহন করতে পারে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর এই...
৬ ঘণ্টা আগে