Ajker Patrika

মোসাব্বির হত্যা: তদন্তে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যে নজর

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমানের জানাজায় নেতা-কর্মীরা। গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই জানাজা হয়। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। ছবি: আজকের পত্রিকা
সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমানের জানাজায় নেতা-কর্মীরা। গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই জানাজা হয়। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজধানীতে গুলি করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বিরের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের সম্ভাব্য যোগসূত্রকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে ঘটনার এক দিন পেরিয়ে গেলেও গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গুলি করা ঘাতককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এর মধ্যে মোসাব্বিরের স্ত্রী জানিয়েছেন, কয়েক দিন আগে থেকে স্বামী তাঁকে গুরুতর হুমকির কথা জানিয়েছিলেন। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ফুটেজে দুজনকে গুলি করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে দেখা গেলেও কাউকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, একজনকে আংশিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেলে তদন্তে বড় অগ্রগতি হবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাব রেস্তোরাঁর পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে আছে দুই ব্যক্তি। মোসাব্বির সেখানে পৌঁছানো মাত্র তারা বস্তার ভেতর থেকে পিস্তল বের করে পেছন দিক থেকে গুলি করে। মোসাব্বির গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর আবার উঠে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর হাতে থাকা মোবাইল ফোন পড়ে যায়। হামলাকারীরা ফোনটি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, প্রথম গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে মোসাব্বির একটি গলির ভেতরে ঢুকে পড়েন। সেখান দিয়ে বের হওয়ার পথ না থাকায় আবার বাইরে আসতেই তাঁকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয়বার গুলি করা হয়। হামলাকারীরা মুহূর্তের মধ্যেই এলাকা ত্যাগ করে।

গুরুতর আহত মোসাব্বির পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে মারা যান। একই ঘটনায় তাঁর সঙ্গে থাকা কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুফিয়ান বেপারি মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন। পাঁজরে গুলি লাগা অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দুজনের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে একজনের চেহারা আংশিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। পুরোপুরি শনাক্ত করা গেলে তদন্তে বড় অগ্রগতি হতে পারে। থানার পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ও র‍্যাব যৌথভাবে তদন্ত করছে।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মোসাব্বির হত্যায় কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ীদের ওপর সাম্প্রতিক হামলা, ফার্মগেট এলাকার একটি গ্যারেজের দখল নিয়ে বিরোধ এবং নিহতের স্ত্রীর করা প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধনে হামলা হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর এলাকার আধিপত্য নিয়ে উত্তেজনা চলছে।

মো. শাহিন নামে পরিচিত একজন জানান, মোসাব্বিরের বাবা একসময় এফডিসিতে চাকরি করতেন। কারওয়ান বাজারে তাঁর একটি জুতার দোকানও ছিল। মোসাব্বির দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদল ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। সিটি নির্বাচনে তিনি ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছিলেন।

মোসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম গতকাল সকালে তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন।

সাংবাদিকদের কাছে সুরাইয়া বেগম বলেন, কয়েক দিন ধরেই তাঁর স্বামী বলছিলেন, যেকোনো সময় কেউ তাঁকে মেরে ফেলতে পারে। বুধবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ই তাঁদের শেষ কথা হয়। তিনি বলেন, ‘মোসাব্বির বলেছিল, “তুমি একটা কফি বানিয়ে দাও, আমি নামাজ পড়ে বের হব।” এরপর আর কোনো কথা হয়নি।’ সুরাইয়া আশা প্রকাশ করেন, সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত করবে।

গতকাল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোসাব্বিরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে বাদ জোহর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল।

মির্জা ফখরুলের দাবি

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এবার মোসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী শাসনের পতনের পর একটি মহল দেশকে অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। দুষ্কৃতকারীদের কঠোরভাবে দমন না করলে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত