Ajker Patrika

জুলাই-আগস্ট হত্যা: ময়নাতদন্ত না হওয়া মামলার তদন্তে যে কৌশল পুলিশের

  • ময়নাতদন্ত না হওয়া মামলার তদন্তে বিশেষ নির্দেশনা পুলিশ সদর দপ্তরের
  • গোসল করানো, দাফনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য নিতে হবে
  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক ১৮৪১ মামলার মধ্যে ১৪০টির অভিযোগপত্র
আমানুর রহমান রনি, ঢাকা 
জুলাই-আগস্ট হত্যা: ময়নাতদন্ত না হওয়া মামলার
তদন্তে যে কৌশল পুলিশের
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ফাইল ছবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত, যাঁদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে, সেসব হত্যা মামলার তদন্তে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী, এসব মামলায় মরদেহের গোসল ও দাফনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ ও স্থান নির্দিষ্ট করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না থাকায় এ ধরনের মামলায় প্রাথমিক আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ ও জনপ্রতিনিধিদের সনদের ভিত্তিতে হত্যার ঘটনা ও জড়িতদের শনাক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া এসব হত্যা মামলায় অপরাধ অনুযায়ী আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মামলা তদারকির জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নেতৃত্বে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি টিম রয়েছে। ওই টিমের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশ সদর দপ্তর ইউনিটগুলোকে এসব মামলা তদন্তে নির্দেশনা দিয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক ১ হাজার ৮৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯১টি এবং অন্যান্য অভিযোগে মামলা ১ হাজার ৫০টি। এসব মামলার মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৬টি হত্যা মামলাসহ ১৪০টিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সূত্র জানায়, গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় ডিএমপির বিভিন্ন থানায় ৪৬৮টি হত্যা মামলাসহ ৭৫৮টি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ডিএমপি ৩৩৪টি হত্যা মামলা এবং অন্যান্য ধারার ২৬৫টি মামলা তদন্ত করেছে। এসব মামলায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সাবেক এমপি, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তাসহ এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৮৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এসব মামলা বিভিন্ন থানার পুলিশ ছাড়াও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) তদন্ত করছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ২৪টি হত্যা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে এবং ২১টি মামলার বিচার চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তর, সিআইডি, এটিইউ ও পিবিআই সূত্র জানায়, জুলাই-আগস্টে আন্দোলনে নিহত অনেকের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের দ্রুত দাফনের কারণে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়নি। পরিবারের ইচ্ছায় ময়নাতদন্ত না করার অনেক ঘটনাও আছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত না হওয়া হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে জটিলতা রয়েছে। কারণ, ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ ও আঘাতের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত প্রয়োজন। তা না থাকলে আসামি সুবিধা পেতে পারে। তাই জটিলতা এড়াতে এবং প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পুলিশ একটি চেকলিস্ট প্রণয়ন করেছে। সে অনুযায়ী মামলার তদন্ত চলছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের ওই চেকলিস্টে বলা হয়েছে, যেসব মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে বিকল্প সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে লাশ গোসল করানো, দাফন বা সৎকারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে। মরদেহ গোসলের সময় শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন, রক্তপাত বা অস্বাভাবিক দাগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।

নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করানো এবং মরদেহ গ্রহণ করা ব্যক্তির জবানবন্দি নিচ্ছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। নির্দেশনায় সরকারি কর্মচারীদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বা তাঁদের কাউকে সাক্ষী করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নিহত ব্যক্তিকে দাফন করা এলাকার বা সংশ্লিষ্ট কবরস্থান সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) বা সিটি করপোরেশনের সনদ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করায় ঘটনাস্থল, দাফনের স্থান এবং সময়ের বিষয়ে প্রশাসনিক নথিপত্র নিশ্চিত করছেন তদন্তকারী।

নিহত ব্যক্তির জীবিত ও মৃত অবস্থার ছবিও সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যে দুটি ছবিই একই ব্যক্তির। এতে পরিচয় জালিয়াতি বা ভুল শনাক্ত করার ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফন হওয়া মরদেহের ক্ষেত্রে গোসল করানো ব্যক্তির কাছ থেকে কেবল আঘাত ও মৃত্যুর বিষয়সংক্রান্ত তথ্য নেওয়া যাবে। ব্যক্তিগত বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশন শুধু মৃত্যুর স্থান ও কবরস্থানের তথ্য দেবে। তাঁদের কাছ থেকে চিকিৎসা বা আঘাতসংক্রান্ত মতামত নেওয়া যাবে না।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, ময়নাতদন্ত ছাড়া হত্যা মামলার তদন্তে প্রমাণ সংগ্রহ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় মৌখিক তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা পরে আদালতে টেকে না। এই চেকলিস্ট অনুসরণ করলে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না থাকলে সেসব ক্ষেত্রেও হত্যা মামলা প্রমাণের অনেক বিষয় রয়েছে। পুলিশ সেগুলো অনুসরণ করছে।

সূত্র জানায়, কার অস্ত্রের গুলিতে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা নিশ্চিত করবে না তদন্তকারী কর্মকর্তা। ঘটনাস্থলের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বে থাকা এবং ওই টিমের কমান্ডিং অফিসারকে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগপত্রে আসামি করা হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এস এম শাহজাহান বলেন, হত্যা মামলায় ময়নাতদন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে ওই প্রতিবেদন। ময়নাতদন্ত ছাড়া হত্যা মামলায় আসামির অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না থাকা মামলার ক্ষেত্রে বিকল্প প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাই হয়তো পুলিশ এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। পুলিশের এই নির্দেশনাকে সেই ঘাটতি পূরণের একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত