Ajker Patrika

সব অপরাধে নারীই কেন শিকার?

অর্ণব সান্যাল
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২২, ১০: ৩৯
সব অপরাধে নারীই কেন শিকার?

গত সাত দিনের মধ্যে পর পর দুটো ঘটনা এ দেশের দুই প্রান্তে ঘটেছে। দুটোই বাসে এবং দুটোতেই শুরুটা হয়েছিল অপরাধের আদি ধরন চুরি-ডাকাতি দিয়ে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই দুটো ঘটনাই শেষ হয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা দিয়ে, নির্দিষ্ট করে বলে যৌন সহিংসতা। তবে কি যেকোনো অপরাধেই নারীকে শিকার বানানোর ট্রেন্ড চালু হলো এ সমাজে?

বর্তমান বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজন যৌন ও অন্যান্য আঙ্গিকের সহিংসতার শিকার হয়ে থাকেন। এটি আন্তর্জাতিক হিসাব। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এমন হিসাব স্বীকার করে থাকে। সেই হিসেবে নারীর প্রতি নিপীড়ন বা সহিংসতা একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু। অনেক উন্নত দেশেই নারীর প্রতি সহিংসতা এখনো চলছে। তবে তীব্রতা বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, সেটির ওপর নির্ভর করে বোঝা যায় একেকটি সমাজ বা দেশ আসলে নারীদের কীভাবে দেখে। আর তাতেই অনুমান করা যায়, নারীর প্রতি সহিংসতা হ্রাসে একটি দেশ বা সমাজ আসলে কতটা উদগ্র।

আমাদের দেশে নারীদের গৃহাভ্যন্তরে রাখার ঐতিহ্য বেশ পুরোনো; অর্থাৎ এই অঞ্চলে নারীরা ঘরকন্না সামলাবেন এবং প্রায়োগিক সব ধরনের অর্থনৈতিক ও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত পুরুষেরা নেবেন—এ চিত্রটি অনেক দিনের। যদিও এই এলাকার একেবারে আদিতে গেলে মাতৃপ্রধান সমাজও মিলবে। সেখানে নারীদের হাতেই অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার ব্যাটন আমরা দেখতে পাই। নানা পথপরিক্রমায় সেই পুরো কাঠামো পরিবর্তিত হতে হতে এখন বর্তমান অবস্থায় এসেছে। যেখানে নারীদের ফের এগিয়ে নিয়ে পুরুষের কাছাকাছি আনার জন্যও সংগ্রাম করতে হচ্ছে। কারণ, পেছানোর যুগগুলোয় নারীদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এতটাই নিচে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল যে, সেসব অতিক্রম করতে আমাদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে।

এককথায় তাই আমাদের দেশের সমাজ পুরোপুরি পুরুষতান্ত্রিক। সেই চেহারাই কি তবে আমাদের নারী নিপীড়নে উৎসাহী করে তোলে? লেখার শুরুতে যে দুটি অপরাধের ঘটনার কথা উঠেছিল, সেগুলোর বিশ্লেষণে গেলেও এই পুরুষতান্ত্রিক চেহারা আমরা দেখতে পাব। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে ২ আগস্ট। সেদিন রাতে কুষ্টিয়া থেকে ঈগল এক্সপ্রেসের একটি বাস যাত্রীদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়। তিন দফায় যাত্রীবেশে বাসে ওঠে ১২-১৩ জনের ডাকাত দল। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর ডাকাত দলের সদস্যরা অস্ত্রের মুখে চালককে সরিয়ে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর যাত্রীদের হাত-মুখ ও চোখ বেঁধে ফেলে তাঁদের কাছে থাকা মোবাইল ফোন, টাকা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হয়। এ সময় এক নারীকে ধর্ষণ করে ছয় ডাকাত। যে নারীকে ধর্ষণ করা হয়, পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তাঁর সঙ্গে ডাকাতদের বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছিল। এমন তর্কাতর্কি তর্কাতীতভাবেই নিশ্চয়ই কোনো পুরুষ যাত্রীও করেছিলেন। কিন্তু পুরুষের ব্যাপারে মারধরেই ‘প্রতিশোধ’ শেষ হলেও, নারীর ক্ষেত্রে তা চলে গেল ধর্ষণে। তা-ও একবার নয়, একাধিকবার। ধর্ষণের শিকার নারী নিজের জবানবন্দিতে আরও জানিয়েছেন, ওই বাসে আরও একজন নারীও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

অর্থাৎ, একটি বিষয় স্পষ্ট যে পুরুষ ডাকাতদের সমাজ নির্মিত ‘পৌরুষ’-এ ওই নারীর প্রতিবাদ ঘা দিয়েছিল। যে সমাজ এ দেশের ছেলেদের করা যেকোনো যৌন হয়রানিকে ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যে সমাজ ২০ বা ২৫ বছরের বোনের দেহরক্ষী হিসেবে ১০ বছর বয়সী ভাইকে নিয়োগ দেয় অহরহ, যে সমাজ নারীদের উত্ত্যক্তকারী তরুণকে দায়মুক্তি দিতে চায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এই বলে যে ‘পোলাপানের বয়স কম’, যে সমাজে নারীর ক্ষোভ প্রকাশকেও ‘বেয়াদবি’ হিসেবে ধরা হয়, যে সমাজে স্বামী-স্ত্রী সমান রোজগারি হলেও রান্নাঘরে গরমে সেদ্ধ হতে হয় নারীকেই—সেই সমাজের তৈরি ‘পৌরুষ’ অবচেতনেই নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নকে নারীকে দাবিয়ে রাখার অস্ত্র হিসেবেই দেখবে। কুষ্টিয়া থেকে রওনা হওয়া বাসটিতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণে আমরা ঠিক সেই পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা এবং পুরুষের পেশিশক্তি প্রমাণের তাড়নাটিই দেখতে পেয়েছি। সেখানে সাধারণ অপরাধপ্রবণতাকে দেওয়া হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক রং। এতে কি ডাকাতির মতো অপরাধকে ছাপিয়ে অপরাধী নিজের ‘যোগ্যতা’ প্রমাণে বেশি ব্যস্ত হয়েছিল? নাকি পুরো অপরাধকর্মটিকে হাওয়া করে দেওয়ার চেষ্টা ছিল? কারণ, কে না জানে নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নকে বালুচাপা দিতে এ সমাজ সিদ্ধহস্ত! আর সেটি করতে গিয়ে অন্যান্য অপরাধও যদি চাপা থাকে, ক্ষতি কী!

একই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় ঘটনাটিতেও। ৫ আগস্ট শুক্রবার রাতে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় চলন্ত বাসে আরেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই বাসে ছিলেন ওই নারী এবং তাঁর স্বামী। বাসের বেশির ভাগ যাত্রী গাজীপুর চৌরাস্তা ও রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তায় নেমে যায়। গাজীপুর সদর উপজেলা হোতাপাড়া এলাকায় পৌঁছার পর ওই নারীর স্বামীকে বাস থেকে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে চলন্ত বাসেই ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয় এবং রাজেন্দ্রপুর এলাকায় জঙ্গলের কাছে তাঁকে বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পুলিশ যদিও এ ঘটনায় জড়িতদের কম সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়েছে এবং লুট করা মালামালও উদ্ধার করেছে।

অর্ণব সান্যাল

এ ঘটনায়ও আমরা দেখতে পাই, অপরাধীদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল টাকাপয়সা লুট করা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন। পুরুষতন্ত্রের মধ্যে নারীর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে, তাঁকে সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে ছোট করে দেখানোর বৈশিষ্ট্য প্রবল। যেহেতু এ দেশে নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নকে নিপীড়কের বদলে ঘটনার শিকার নারীরই অমর্যাদা বলে ধরে নেওয়া হয়, সুতরাং এ সমাজে প্রতিষ্ঠিত পুরুষতন্ত্রও সেটিকে নারীকে দাবিয়ে রাখার ‘হাতিয়ার’ হিসেবে মেনে নিতেই পারে এবং সেই প্রবণতা থেকে যেকোনো অপরাধকে নারীর প্রতি সহিংসতায় রূপ দিতে পারেন এখানকার পুরুষেরা।

এতটুকু পড়ে কেউ কেউ বলতেই পারেন, এসব ‘ফাউ’ কথা! আসলে অভিযুক্ত পুরুষেরা অপরাধপ্রবণ ছিলেন, তাই অপরাধ করেছেন। তাঁদের কাছে অপরাধটাই আসল, নারী-পুরুষ উপলক্ষমাত্র। সহিংসতার যে তাত্ত্বিক সংজ্ঞা, তাতে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ নেই।

হ্যাঁ, তা বলা যেতেই পারে। সাধারণ অর্থে যে সহিংসতা বোঝানো হয়, সেটি নানা কারণেই হতে পারে। তবে সভ্যতা যত এগিয়েছে, সহিংসতার ধারণাও তত বহুমাত্রিক হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় নারীর প্রতি এই সহিংসতার পেছনে সমাজে নারীর অবস্থান এবং পুরুষতন্ত্রকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। যেমন উল্লেখ করা যায় ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক ক্যারি এল ইয়োডানিসের একটি গবেষণাপত্রের কথা। ‘জেন্ডার ইনইকুয়ালিটি, ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন অ্যান্ড ফিয়ার: এ ক্রস ন্যাশনাল টেস্ট অব দ্য ফেমিনিস্ট থিওরি অব ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ শীর্ষক ওই গবেষণাপত্রটি দশকের বেশি সময় আগের, প্রকাশিত হয়েছিল বিভিন্ন বিখ্যাত জার্নালে। তাতে গবেষক লিখেছিলেন, নারীদের প্রতি যৌন নিপীড়নের সঙ্গে তাঁদের শিক্ষা ও পেশাগত মর্যাদার বিষয়টি জড়িত। যেসব দেশে সামগ্রিকভাবে নারীদের মর্যাদা কম, সেসব দেশে তাঁদের প্রতি যৌন সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। তা ছাড়া, সেসব দেশে যৌন সহিংসতা নিয়ে ভয় বা আতঙ্ক পুরুষদের তুলনায় নারীদের ভেতর বেশি থাকে।

আমাদের সমাজে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা ও আতঙ্ক মনে পুষেই প্রত্যেক মেয়ে একসময় পূর্ণ নারী হয়ে ওঠেন। এই আতঙ্ক ও ভয় কতটা, সেটি জানার জন্য পরিবার বা বন্ধুমহলে একটু খোঁজখবর করাই যথেষ্ট। এ দেশে নারী পরিবারে নিগৃহীত হন, রাস্তায়-গণপরিবহনে-অফিসে নিপীড়িত হন হরহামেশা। এভাবেই এ সমাজের সিংহভাগ নারীর মনে ভয় সৃষ্টি হয়। কারণ প্রতিকারের রাস্তায় আমাদের সমাজ সেভাবে হাঁটে না কখনোই; বরং আওয়াজ তোলা নারীরই গলা টিপে ধরা হয় বারবার। এমন প্রেক্ষাপটে নারীর মধ্যে জাগিয়ে তোলা ভয়কে পুঁজি করে একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজই নারীর প্রতি সহিংসতাকে নিয়ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে—এমনটা বললে কি ভুল হবে?

তবে হ্যাঁ, প্রতিকারের ব্যবস্থা এ দেশে আইনিভাবে আছে ভালোমতোই। গ্রেপ্তার হচ্ছে, মামলা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনার ঘনঘটা কমানো যাচ্ছে না। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক আন্দোলন, প্রয়োজন সমাজকে বদলানো। সেই বদলানোর গতি এতটাই ধীর যে আইনি লড়াইয়ে জিতেও আসলে মর্যাদার দৌড়ে পিছিয়ে যেতে হচ্ছে অনেক নারীকে। হারতে হচ্ছে সমাজের অশোভন দৃষ্টিভঙ্গির কাছে।

শেষটা করা যাক ‘ফেমিসাইড’ (Femicide) দিয়ে। ১৯৭০ সালের পর থেকে এ শব্দটি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে ওঠে। ফেমিসাইডকে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সবচেয়ে ঘৃণ্য ও চরম মাত্রা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর দুটি ধরন আছে—একটিতে সহিংস আচরণের কর্তা হিসেবে থাকেন ঘনিষ্ঠরা, অন্যটিতে একেবারে অপরিচিতরা। দুটোতেই শুধু লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণেই একজন নারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয় বা তাঁর সঙ্গে সহিংস আচরণ করা হয়।

এ দেশে তনু বা রূপার মৃতদেহ আমরা দেখেছি খুব বেশি দিন হয়নি। সাম্প্রতিক দুটো ঘটনায় হয়তো সহিংসতার শিকার নারী প্রাণে বেঁচে গেছেন কোনোক্রমে। কিন্তু ক্ষত জ্বলজ্বল করছে ঠিকই। এ সমাজটায় ফেমিসাইড প্রবণতা হয়ে ধরা না দিক। এর চেয়ে বরং সমাজটাকে বদলে একটু মনুষ্য উপযোগী করে ফেলা যাক!

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত