Ajker Patrika

বাজেট ২০২৬-২৭ /লক্ষ্য বড়, দুশ্চিন্তা টাকার

শাহ আলম খান, ঢাকা
আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৯: ৪৯
লক্ষ্য বড়, দুশ্চিন্তা টাকার
ছবি: সংগৃহীত

‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই সম্প্রসারণমূলক বাজেটের মাধ্যমে সরকার একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা দিতে চায়, অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে চায় ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের ভিত গড়ে তুলতে। এবারেরটি হবে দেশের ৫৫তম এবং বিএনপি সরকারের চতুর্থ মেয়াদের প্রথম বাজেট।

দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত থাকার মধ্যে এই বাজেট-বিষয়ক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যটি সামনে আনা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরেই ৯ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। ব্যাংক খাত রয়েছে খেলাপি ঋণের বোঝা ও তারল্যসংকটের চাপের মুখে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। রাজস্ব আহরণও ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার নিচে অবস্থান করছে। এমন প্রেক্ষাপটে তৈরি করা বাজেটটি কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনীতিকে পথে ফেরানোর ক্ষেত্রে কতটা দক্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা হবে, তা-ও দেখার বিষয় হবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। বাজেটের আকার জিডিপির প্রায় ১৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের অংশ ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতের অংশ ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন, সবার সুবিধা ও স্বার্থের ভারসাম্য বিবেচনায় রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, উৎপাদন বাড়ানো, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে একটি সুষম সমন্বয় তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু এবারের বাজেট বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হবে অর্থের জোগান নিয়ে। সরকার আগামী অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। অর্থাৎ সরকারের মোট আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই নির্ভর করছে কর ও রাজস্ব আহরণের ওপর।

কিন্তু রাজস্ব আহরণে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা আশাবাদী হওয়ার খুব বেশি সুযোগ দিচ্ছে না। এনবিআর ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। আমদানি কমে যাওয়াসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থর গতি, করজালের সীমাবদ্ধতা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের কারণে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে এক অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের লাফের এই লক্ষ্যকে অনেক অর্থনীতিবিদই উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন।

সরকার অবশ্য করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করভিত্তি সম্প্রসারণের পথ বেছে নিয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে। প্রতি এক হাজার টাকার পণ্যে এর অঙ্ক হবে মাত্র ২ টাকা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও ‘নো-ফ্রিলস’ হিসাব ছাড়া প্রায় সব নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এনবিআরের তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে কেন্দ্রীয় তথ্য সমন্বয়ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এবার সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য বড় এবং ব্যয়ের পরিকল্পনা তার চেয়েও বড়। আগামী অর্থবছরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো, কৃষি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিপুল ব্যয়ের পরিকল্পনার বিপরীতে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আসবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক উৎস থেকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই বাজেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে। কারণ, চলতি অর্থবছরেও সরকার বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক বিলম্ব এবং উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত পূরণে সময়ক্ষেপণের কারণে প্রত্যাশিত অর্থছাড় পাওয়া যায়নি। তবে সরকারের যুক্তি হলো, নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সেই লক্ষ্যেই ব্যয়ের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তাগুলোর একটি রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ক্ষেত্রে। ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, এর ফলে বাজারে সরবরাহব্যবস্থা সহজ হবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমবে।

স্বাস্থ্য খাতেও থাকছে উল্লেখযোগ্য কর সুবিধা। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ও অগ্রিম কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর ফলে একজন রোগীর প্রতি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্র আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও কর অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

তরুণদের কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছে। আইটি খাতের বাইরে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেটের জন্য কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয়ও করমুক্ত রাখা হচ্ছে। স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে। উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল গঠনের উদ্যোগও রয়েছে। যুবসমাজকে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে সরকার।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ২৫ লাখ নাগরিককে ই-হেলথ কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হচ্ছে। যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ বিদেশি প্রতিষ্ঠানে পরিশোধের ক্ষেত্রে উৎসে কর ১৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশে কমানো হচ্ছে। রি-ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়ামের ওপর কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎকে এগিয়ে নিতে এ খাতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর শূন্য করার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব থাকছে।

ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। লাইসেন্স, অনুমোদন এবং ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা এক জায়গা থেকে পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে এনবিআরের কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাজেটে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বাজেটের দর্শন প্রবৃদ্ধিমুখী হলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থের জোগান এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা। উন্নয়ন ব্যয় কত দ্রুত এবং কত দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই বাজেট কতটা সফল হবে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর মনে করেন, করছাড় ও বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক। তবে জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানো ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ এবং বিকেন্দ্রীকরণ। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, এই বাজেটের মধ্য দিয়েই ট্রিলিয়ন ডলার (১০০০ বিলিয়ন) অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের দীর্ঘ যাত্রার ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত