Ajker Patrika

ইইউতে পোশাকের দামে পতন

রোকন উদ্দীন, ঢাকা
ইইউতে পোশাকের দামে পতন
ফাইল ছবি

২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বৈশ্বিক তৈরি পোশাকের একক দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এই সময়ে ইউরোজোনে পোশাকের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায়, দেশগুলোর প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায়, ক্রেতারা দামে কড়াকড়ি রাখায় এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের অভাব থাকায় দাম হ্রাস পেয়েছে।

ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বাজারে ২০২৫ সালে বৈশ্বিকভাবে ৯০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২.১০ শতাংশ বেশি। এ সময় বাজারটিতে তৈরি পোশাকের রপ্তানি পরিমাণ বেড়েছে ১৩.৭৮ শতাংশ, তবে এর বিপরীতে গড় একক দাম ১০.২৭ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ বাজারে সামগ্রিকভাবে তৈরি পোশাকের দামের ওপর একটা দৃশ্যমান চাপ পরিলক্ষিত হয়।

এই পরিস্থিতিতে কিছু দেশ উচ্চমূল্যের অর্ডার ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে ভিয়েতনামের অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভিয়েতনাম এই সময়ে রপ্তানি ৯.৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে একক দাম ৪.৫১ শতাংশ বেড়েছে। তুরস্ক ও মরক্কোয় যথাক্রমে ৪.০৭ ও ৩.৩৮ শতাংশ একক দাম বেড়েছে। বাকি প্রতিযোগী দেশগুলো এ সময় ইইউর বাজারে বড় পরিসরে একক দাম হারায়। সেই তালিকায় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও অন্যতম।

তবে লক্ষণীয় ব্যতিক্রমী বিষয়টিও নজর এড়ায়নি কারও। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে এই জোনে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯.৪১ বিলিয়ন ইউরোতে, যা ২০২৪ সালের ১৮.৩২ বিলিয়ন ইউরোর তুলনায় ৫.৯৭ শতাংশ বেশি। এ সময় রপ্তানির পরিমাণ ১০.২০ শতাংশ বেড়েছে, তবে পরিমাণে বাড়লেও আয়ের অনুপাতে প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। কারণ, একক দাম কমেছে ৩.৮৪ শতাংশ।

ডিসেম্বর ২০২৫-এ রপ্তানি মূল্য আগের বছরের তুলনায় ১২.০৫ শতাংশ কমেছে, একক দাম ১১.৫০ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত ভলিউমের ওপর নির্ভর করছে। উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রি বাড়ানোর বদলে কমদামের পণ্যের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে বাজারে টিকে থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়াতে সমস্যা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘চীন থেকে সরে আসা উচ্চমূল্যের অর্ডারগুলো ভিয়েতনাম নিতে পারছে। ধীরে ধীরে তারা চীনের বিকল্প হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের প্রস্তুতি থাকলে আমরাও ইইউতে এই সুযোগ নিতে পারতাম।’

অন্যদিকে চীন, ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাও রয়েছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির কাতারে, তবে দেশগুলো ইইউর বাজারে আনুপাতিক হারে একক দাম হারিয়েছে। এ সময় চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১.১৭ শতাংশ, পরিমাণ বেড়েছে ১১.৬৪ শতাংশ, কিন্তু একক দাম কমেছে ৯.৩৮ শতাংশ। ভারতের রপ্তানি বেড়েছে ৭.৯৯ শতাংশ, একক দাম কমেছে ৪.৯৬ শতাংশ। পাকিস্তান ৯.৬৪ শতাংশ রপ্তানি বাড়ার বিপরীতে ২.১৯ শতাংশ একক মূল্য হারিয়েছে। কম্বোডিয়ার রপ্তানি ১৪.৬৬ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু একক মূল্য কমেছে ৮.৫৮ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাও একই প্রবণতা দেখিয়েছে।

বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্রেতা ধরতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ব্যয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নানা চাপে আমরা জর্জরিত। ফলে পরিমাণ বাড়লেও সেই অনুযায়ী আয় বাড়ানো যাচ্ছে না।’

একই সংগঠনের সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বাজার অংশীদারত্ব ধরে রাখতে আমরা পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে সক্ষম হলেও একক মূল্য হ্রাস রপ্তানি আয়ে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে বছরের শেষভাগে নিম্নমুখী প্রবণতা আমাদের সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।’

এদিকে ইইউ ও ভারতের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার বৈচিত্র্যে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ ভলিউমের বাজারে টিকে থাকলেও ভ্যালুর লড়াইয়ে আরও পিছিয়ে পড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত