Ajker Patrika

বাংলা কিউআর: ক্যাশলেস যাত্রায় বড় বাধা ইন্টারনেট

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
বাংলা কিউআর: ক্যাশলেস যাত্রায় বড় বাধা ইন্টারনেট

নগদবিহীন (ক্যাশলেস) লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশে চালু হয়েছে সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা। এখন একটি কিউআর কোড ব্যবহার করেই ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং অন্যান্য পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করা যাবে। একই সঙ্গে এই ব্যবস্থায় কেনাকাটায় মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) সর্বোচ্চ ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এর মধ্যে ভ্যাটও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সেবার বাইরে থাকায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রস্তুতি ছাড়া এটি বাধ্যতামূলক করা হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে; বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল, চর ও পাহাড়ি এলাকা, নিম্ন আয়ের পরিবার, বয়স্ক নাগরিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম।

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ক্যাশলেস লেনদেনের উদ্যোগটি সময়োপযোগী। ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো ইন্টারনেট সুবিধা ও ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। তাই সরকারকে অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনসচেতনতায় আরও সক্রিয় হতে হবে।

রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও মগবাজার এলাকার বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী এখনো ‘বাংলা কিউআর’ সম্পর্কে জানেন না। বেশির ভাগই বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিউআর কোড ব্যবহার করছেন। অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার সুবিধা বা ব্যবহারবিধি সম্পর্কেও তাঁদের স্পষ্ট ধারণা নেই।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নগদ লেনদেনে পুরো অর্থ হাতে পাওয়া গেলেও বাংলা কিউআর লেনদেনে নির্ধারিত হারে অর্থ কেটে নেওয়া হবে; পাশাপাশি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজনীয়তাও তাঁদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

মতিঝিলের ঝালমুড়ি বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘নগদ টাকায় লেনদেন করেই কাস্টমার সামলাতে পারি না। ফোনে প্রতিবার লেনদেন করতে গেলে বিক্রি কমে যাবে।’

রাজধানীর বাইরে অসংখ্য দোকান, হাটবাজার, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। অনেকের ব্যাংক হিসাব নেই, আবার অনেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত নন। ব্যবসায়ীদের মতে, কিউআর ব্যবহারের জন্য স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা—সবই প্রয়োজন। এগুলো নিশ্চিত না করে বাধ্যতামূলক করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন।

এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এক কিউআর কোডের আওতায় সব ব্যাংক ও এমএফএস চলে আসায় গ্রাহকের লেনদেন আরও সহজ হবে এবং ব্যয়ও কমবে। ভবিষ্যতে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের পরিবর্তে কিউআরভিত্তিক লেনদেন দ্রুত বাড়বে। তবে এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও জনসচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এর আগে, ২০২৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলা কিউআর চালু হলেও সেটি স্থায়ী হয়নি। এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসেবে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিকাশের প্রায় ৯ লাখ, নগদের সাড়ে ৪ লাখ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের (রকেটসহ) ২ লাখ ৭০ হাজার, পূবালী ব্যাংকের ১ লাখ ৯০ হাজার, ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার, সোনালী ব্যাংকের ৫৪ হাজার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫০ হাজার এবং সিটি ব্যাংকের ৩৮ হাজার কিউআর কোড রয়েছে। এসব কিউআর কোড এখন বাংলা কিউআরে রূপান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ও ১ জুলাই—এই দুই দিনে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ৭৭ হাজার ১৬৫টি লেনদেন হয়েছে, এতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ২২ কোটি টাকা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, আগে এটি শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাইলট প্রকল্প ছিল, এবার সরকারেরও অগ্রাধিকার কর্মসূচি। ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে কীভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত