
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহে এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা একসময় বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি কোনায় আঘাত হানবে। তবে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—কিছু দেশ এই সংকটের ধাক্কার সামনে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বা তা মোকাবিলার সক্ষমতা তুলনামূলক কম। নজরে রাখার মতো কয়েকটি অর্থনীতি নিচে তুলে ধরা হলো।
জি৭-এর বড় অর্থনীতিগুলো
প্রথমেই ইউরোপের দিকে তাকাতে হবে। নতুন জ্বালানি ধাক্কা অঞ্চলটিকে ৪ বছর আগে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের তিক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেই ঘটনা ইউরোপের আমদানি-নির্ভরতা স্পষ্ট করে তোলে এবং মুদ্রাস্ফীতি দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছে দেয়।
জার্মানি: শিল্পনির্ভর এই অর্থনীতির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশটির উৎপাদন খাতের সংকোচন থেমেছে মাত্র। আর বড় রপ্তানিকারক হওয়ায় বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলে জার্মানিও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গত বছর ঘোষিত বিশাল প্রণোদনা কর্মসূচি কিছুটা ধাক্কা সামাল দিতে হয়তো সাহায্য করবে, তবে আগামী বছরের বাজেট ঘাটতির কারণে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত।
ইতালি: এখানেও বড় উৎপাদন খাত রয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপে প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারে তেল ও গ্যাসের অংশ দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ।
ব্রিটেন: অন্যান্য বড় ইউরোপীয় অর্থনীতির তুলনায় এর বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল। গ্যাসের দামই সাধারণত বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করে, আর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গ্যাসের দাম তেলের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। জ্বালানি মূল্যসীমা প্রাথমিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা কমাবে। তবে এতে সুদের হার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, ফলে বাড়তি বেকারত্বের সময় ব্রিটেন দীর্ঘদিন জি৭-এর মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণব্যয়ের দেশ হয়ে থাকতে পারে। বাজেটের চাপ ও বন্ড বাজারের চাপ ব্যবসা ও পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত করছে।
জাপান: এই দেশটিও সরাসরি ঝুঁকির মুখে। দেশটি প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল ইয়েনের কারণে আগেই তৈরি হওয়া মুদ্রাস্ফীতির চাপ, যা আমদানিনির্ভর খাদ্য ও দৈনন্দিন পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে।
উদীয়মান বড় অর্থনীতিগুলো
গালফ তথা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল নিজেই সরাসরি অর্থনৈতিক আঘাতের মুখে এবং কিছু পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে এ বছর অঞ্চলটির অর্থনীতি সংকুচিত হতে পারে, যা যুদ্ধের আগে প্রত্যাশিত শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির বিপরীত। তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়া কোনো কাজে আসবে না যদি হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং বিশেষ করে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন তাদের জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে না পারে।
সংঘাত প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, যা প্রতি বছর স্থানীয় অর্থনীতিতে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার এনে দেয়।
ভারত: আরেকটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতি। দেশটি প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং প্রায় অর্ধেক তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানি করে। সেই তেলের প্রায় অর্ধেক এবং এলপিজির আরও বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। অর্থনীতিবিদরা ইতিমধ্যেই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাচ্ছেন এবং রুপি রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে গেছে। ভারতের রেস্তোরাঁ ও রান্নাঘরে গ্যাসের দাম বাড়ায় অনানুষ্ঠানিক রেশনিং শুরু হয়েছে, ফলে সমুচা, দোসা ও চা-এর মতো গরম খাবার ও পানীয় মেনু থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।
তুরস্ক: সংকট দীর্ঘায়ত হলে ইরানের প্রতিবেশী হওয়ায় সম্ভাব্য শরণার্থী ঢল ও বাড়তি ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রধান অর্থনৈতিক চাপ পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর। দেশটি আবারও অতীতের মুদ্রাস্ফীতি সংকটের পুনরাবৃত্তির মুখে। এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার সুদের হার কমানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হয়েছে এবং মুদ্রা রক্ষায় প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বিক্রি করা হয়েছে।
সবচেয়ে নাজুক দেশগুলো
কিছু দেশ রয়েছে যারা সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে বা খুব কাছাকাছি গিয়েছিল, ফলে তারা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও মিসর অন্যতম।
শ্রীলঙ্কা: জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারি খাতের কর্মীদের জন্য প্রতি বুধবার ছুটি ঘোষণা করেছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় গণপরিবহন স্থগিত এবং জ্বালানি কেনায় সীমা আরোপ করে ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ চালু করা হয়েছে।
পাকিস্তান: মাত্র ২ বছর আগে বড় সংকটের দ্বারপ্রান্তে ছিল। এখন পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয়েছে এবং দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারি দপ্তরের জ্বালানি বরাদ্দ অর্ধেক করা হয়েছে, নতুন এয়ার কন্ডিশনার ও আসবাব কেনা নিষিদ্ধ, এবং সরকারি যানবাহনের একটি অংশ ব্যবহার বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মিসর: জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি সুয়েজ খাল ও পর্যটন আয়ের বড় পতনের আশঙ্কা রয়েছে। পর্যটন খাত একাই গত বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। এ ছাড়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিজস্ব মুদ্রার প্রায় ৯ শতাংশ অবমূল্যায়নের কারণে মার্কিন ডলারে নেওয়া বিপুল ঋণ পরিশোধ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি বা ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
১১ ঘণ্টা আগে
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকারগুলো বিশ্বের মোট সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বহন করে। কিন্তু পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই জলপথ শুধু জ্বালানির রুট নয়, ১০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনরেখা।
১ দিন আগে
ভারতের ‘বস্ত্র নগরী’ হিসেবে পরিচিত গুজরাটের সুরাট এখন এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার প্রভাবে সৃষ্ট এলপিজি গ্যাস-সংকটে সুরাটের বিশাল টেক্সটাইল শিল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। রান্নার গ্যাসের অভাবে নাভিশ্বাস ওঠা হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক কাজ ফেলে শহর...
১ দিন আগে
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রণক্ষেত্রে চলছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম।
২ দিন আগে