Ajker Patrika

পরীক্ষার ফল প্রকাশ: ছোট ছোট পরিবর্তনে বড় বদল আসুক

বিমল সরকার
পরীক্ষার ফল প্রকাশ: ছোট ছোট পরিবর্তনে বড় বদল আসুক

শিক্ষা বোর্ডগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত একেকটি পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা বা না করার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন আসে, পাবলিক পরীক্ষার মতো বিষয়েও যদি খোদ প্রধানমন্ত্রীকে সম্পৃক্ত করতে হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা বোর্ডগুলো রয়েছে কেন এবং তাদের কাজই-বা কী।

সম্ভবত রেওয়াজটি চালু হয় বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে। শেখ হাসিনার সময় এটি ব্যাপক আকার ধারণ করে। এসএসসি-এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন প্রথমে এর সার-সংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হতো। যে সরকারের আমলেই বিষয়টি চালু করা হোক না কেন, কেউ বিষয়টির ওপর কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে এটি এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

আমরা লক্ষ করেছি, পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান এবং আশির দশকে এইচ এম এরশাদের আমলে, এমনকি নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধেও শিক্ষা বোর্ডগুলো নিজ নিজ দায়িত্বে এসএসসি, এইচএসসি এবং সমমান পরীক্ষার ফল ঘোষণা করেছে। ফল প্রকাশ নিয়ে কোনো বাহুল্য নেই, দু-চার দিন আগেও সাধারণ কারও পক্ষে অনুমান করাটা ছিল এক অকল্পনীয় ব্যাপার। ফল প্রকাশের পর পত্রিকাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সপ্তাহব্যাপী উত্তীর্ণদের বর্ণনা ও রোল নম্বর ছাপা হয়েছে। অবশ্য সময়-পরিক্রমায় এখন চিত্র বদলেছে।

এসএসসি-এইচএসসি ও সমমান একেকটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ফল প্রকাশের সময়টি ঘনিয়ে এলে প্রতিবছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোকে বিশেষ তৎপর হতে দেখা যায়। এ সময়ে শিক্ষা বোর্ডের পদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। ফল প্রকাশ নিয়ে প্রথমত ৯টি সাধারণ এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ মোট ১১টি বোর্ডের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। সব কটি শিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ঢাকা বোর্ডকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। ফল প্রকাশের আগমুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ত এবং বিশেষ তৎপর হয়ে ওঠার বড় কারণ প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সরকারি দপ্তর।

প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত একেকটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ঢাকা বোর্ড শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে থাকে। মন্ত্রণালয় ফল প্রকাশের জন্য কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় হাতে রেখে একাধিক তারিখ নির্ধারণ করে গণভবনে পাঠায়। এভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বোর্ড বা মন্ত্রণালয় নির্ধারিত তারিখগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটির অনুকূলে সম্মতি বা নতুন কোনো তারিখ নির্ধারণ করে দিলে অবশেষে ফল প্রকাশের চূড়ান্ত দিন-ক্ষণ জানিয়ে দেওয়া হয়। ফল প্রকাশের দিন নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত সকাল ১০টা বা বেলা ১১টা) শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ফলের কপি তাঁর হাতে তুলে দেন। এ সময় পূর্বনির্ধারিত কোনো প্রতিষ্ঠানের (স্কুল বা কলেজ) দুই-একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে ফল নিয়ে কথা বলেন। এ আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের নিয়ে চলে যান তাঁর মন্ত্রণালয়ে। সেখানে সম্মেলনকক্ষে আমন্ত্রিত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা আগে থেকে উপস্থিত থাকেন। সংবাদ সম্মেলনে (সাধারণত দুপুরে) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন এবং এ-সম্পর্কিত খুঁটিনাটি তথ্য তুলে ধরেন। সে সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন শিক্ষামন্ত্রী।

প্রায় তিন দশক ধরে চলে আসা এই রেওয়াজের ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা। ওয়ান-ইলেভেন প্রসূত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুরো দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। এ সময় (২০০৭-২০০৮) এসএসসি, এইচএসসি ও সমমান সব কটি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অথবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। কখনো শিক্ষা উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান তাঁর দপ্তরে, কখনো আবার শিক্ষাসচিব তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে ঢাকা বোর্ডের সম্মেলনকক্ষে উপস্থিত হয়ে ফল ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের বদলে শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলনকক্ষে কেন ফল প্রকাশ, স্বাভাবিকভাবে মানুষের তা জানার আগ্রহ ছিল। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন শিক্ষাসচিব মোমতাজুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, যেহেতু ফল প্রকাশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অনুষ্ঠান, তাই এটি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে হওয়া প্রয়োজন।’

অবশ্য ২০০১ সালের এসএসসি, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছিল ‘রেওয়াজ’ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের হাত দিয়ে তাঁর দপ্তর যমুনা থেকে। ২৬ বছরের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক (২০০১ ও ২০০৭-২০০৮) এবং অন্তর্বর্তী (২০২৪-২০২৬) সরকারের এ এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস।

পাবলিক পরীক্ষার ফল বোর্ড যেকোনো সময় প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সরকারি সফরে বিদেশে থাকায় ফল প্রকাশ করা তো দূরের কথা, প্রকাশের তারিখটি পর্যন্ত চূড়ান্ত করতে না পারার নজির আছে।

পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সঙ্গে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে জড়ানোর এমন দৃষ্টান্ত আর কোনো দেশে আছে কি না, তা জানা নেই। ১৭ বছর (২০০৯-২০২৫) পর ফল ঘোষণার অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করে আবারও ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। ২০২৪ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় ১৫ অক্টোবর (২০২৪)। বেলা ১১টায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার শিক্ষা বোর্ডে সংবাদ সম্মেলন করে এ ফল প্রকাশ করেন। অন্তর্বর্তী শিক্ষা উপদেষ্টা ফল প্রকাশের দায়িত্ব শিক্ষা বোর্ডের ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। ফলে দীর্ঘদিনের রীতি পরিবর্তন হয়। ২০২৫ সালের এসএসসি, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলও একইভাবে শিক্ষা বোর্ডের তত্ত্বাবধানেই প্রকাশিত হয়। ফল প্রকাশে অহেতুক প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারপ্রধানকে না জড়িয়ে শিক্ষা বোর্ডগুলো যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে কি না জানি না।

শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, এ বছরের ২০ জুলাই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হবে। এটাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গঠিত বিএনপি সরকারের আমলে বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত প্রথম পরীক্ষা। আমরা আশা করব, ছোট ছোট পরিবর্তন জাতীয় জীবনে বড় পরিবর্তনের পথ দেখাবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত