Ajker Patrika

স্থগিত দুস্থ ভাতা, অনিশ্চিত জীবন: তবু খমকের ছন্দে বাঁচার স্বপ্ন

সাদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও 
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ২০
স্থগিত দুস্থ ভাতা, অনিশ্চিত জীবন: তবু খমকের ছন্দে বাঁচার স্বপ্ন
বাউলশিল্পী মীর ছানোয়ার হোসেন ছানু। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাতে খমক, কণ্ঠে আধ্যাত্মিক গান। গ্রামের হাটবাজার কিংবা শহরের কোনো খোলা জায়গা—যেখানেই গান ধরেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে ঘিরে ভিড় জমে যায়। কেউ দাঁড়িয়ে শোনেন, কেউ মাটিতে বসে পড়েন। তাঁর কণ্ঠে কখনো লালন, কখনো শাহ আবদুল করিম, আবার কখনো শাহ আলম সরকারের লোকগান। খমকের ছন্দে একের পর এক গান করে চলেন তিনি।

এভাবেই প্রায় পাঁচ দশক ধরে গানকে সঙ্গী করে পথ চলছেন ঠাকুরগাঁও শহরের মন্দিরপাড়ার বাসিন্দা মীর ছানোয়ার হোসেন ছানু (৬৩)। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, পেয়েছেন শিল্পী হিসেবে পরিচিতিও। কিন্তু গান গেয়ে তাঁর সংসারে সচ্ছলতা আসেনি।

ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি গভীর টান ছিল ছানুর। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবা মীর আব্দুল করিমের হাত ধরে গান শেখা শুরু করেন। তাঁর বাবা ঢাকার গাজীপুরের মাইজভান্ডারি তরিকার পীর আবু রাজ্জাক হায়দারীর শিষ্য ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই আধ্যাত্মিক গান ও লোকসংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন ছানু। ধীরে ধীরে গানই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান অবলম্বন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাউলশিল্পী হিসেবে ডাক পেলে ছুটে যান তিনি। মঞ্চের পাশাপাশি গ্রামের হাটবাজার, পথঘাট কিংবা খোলা জায়গায় খমক হাতে গান গাইতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একতারা বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্রের বদলে খমকের ছন্দে তাঁর পরিবেশনা আলাদা করে টানে মানুষকে।

ছানু গান ধরলেই আশপাশের মানুষ কাজ থামিয়ে তাঁর চারপাশে জড়ো হন। কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন, কেউ মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর গান শুনতে আসা আবদুল জলিল বলেন, ‘অনেক শিল্পীর গান মঞ্চে শুনেছি। কিন্তু ছানু ভাইয়ের গান একেবারে আলাদা। তিনি খুব সহজভাবে মানুষের কাছে গান পৌঁছে দেন। তাঁর গান শুনলে মনে হয় গ্রামের মাটির মানুষের কথাই শুনছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ছানু ভাই গান শুরু করলে মানুষ নিজের অজান্তেই তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তাঁর গানের মধ্যে একটা আলাদা টান আছে। বিশেষ করে খমকের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের মিলটা খুব ভালো লাগে।’

হাটে গান শুনতে আসা শিউলি আক্তার বলেন, ‘তিনি যখন আধ্যাত্মিক গান করেন, তখন আশপাশের মানুষ চুপ হয়ে যায়। ছোট-বড় সবাই দাঁড়িয়ে শোনে। এত মানুষ তাঁর গান পছন্দ করলেও শিল্পী হিসেবে তাঁর জীবনটা যে এত কষ্টের, তা আগে জানতাম না।’

ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশ বেতারের লোকসংগীতের নিয়মিত শিল্পী হিসেবেও গান করেন ছানু। লালনগীতি, শাহ আবদুল করিম ও শাহ আলম সরকারের জনপ্রিয় লোকগান তাঁর কণ্ঠে প্রায়ই শোনা যায়। তবে নিজের মৌলিক গান কিংবা বড় মঞ্চের পরিচিতির চেয়ে মানুষের কাছে তাঁর আলাদা পরিচয়—খমক হাতে পথে-প্রান্তরে গান গাওয়া এক বাউল শিল্পী।

তবে মানুষের এই ভালোবাসার বিপরীতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন খুব একটা সচ্ছল নয়। গানই তাঁর প্রধান পেশা। একসময় সাইনবোর্ড লেখা ও বিভিন্ন ধরনের আর্টের কাজ করতেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারে সেই কাজও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন গান গেয়েই যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে হয়।

ছানু হোসেনের দুই ছেলে। তাঁরা দুজনই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং নিজেদের সংসার নিয়ে থাকেন। বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে মন্দিরপাড়ার বাড়িতে থাকেন এই বাউল শিল্পী। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে ভালো নেই বলে জানান তিনি।

ছানু বলেন, ‘গানই আমার পেশা। আগে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক ডাক আসত। এখন মানুষ ইউটিউব, ফেসবুক ও ইন্টারনেটে গান শোনে। আগের মতো ডাকও আসে না। তারপরও গান ছাড়া থাকতে পারি না।’

সরকারের কাছ থেকেও একসময় কিছুটা সহায়তা পেতেন তিনি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে দুস্থ শিল্পী হিসেবে প্রতিবছর সাড়ে ১৪ হাজার টাকা করে পেতেন। কিন্তু গত দুই বছর ধরে সেই সহায়তা আর পাচ্ছেন না। কেন বন্ধ হয়েছে, তারও কোনো কারণ জানেন না বলে জানান তিনি।

ঠাকুরগাঁও শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আলমগীর কবির বলেন, ‘অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসনের কাছে তালিকা পাঠানোর পর ছানু হোসেন বাদ পড়েছেন। শুধু তিনি নন, যাচাই-বাছাইয়ে আরও কয়েকজন শিল্পী বাদ পড়েছেন। তবে অসচ্ছল শিল্পীদের কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’

ছানুর আক্ষেপ, মানুষের ভালোবাসা থাকলেও শিল্পীদের জীবন সব সময় সচ্ছল হয় না। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসচ্ছল লোকশিল্পীদের নিয়মিত সহায়তা প্রয়োজন। তাঁর মতে, লোকসংগীত ও বাউলগান টিকিয়ে রাখতে শুধু শিল্পীর গান শোনাই যথেষ্ট নয়, তাঁদের জীবন-জীবিকার দিকটিও দেখতে হবে।

তবু অর্থকষ্ট থামাতে পারেনি তাঁর গান। খমক হাতে এখনো ছুটে যান গ্রাম থেকে গ্রামে, হাট থেকে হাটে। কোথাও কয়েকজন, কোথাও শতাধিক মানুষ তাঁকে ঘিরে দাঁড়ান। মানুষের সেই ভালোবাসাকেই জীবনের বড় পাওয়া মনে করেন ছানু।

তিনি বলেন, ‘গানকে ভালোবেসেই এত বছর পার করেছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গান গেয়ে যেতে চাই। যত দিন গলায় সুর থাকবে, তত দিন পথে-প্রান্তরে মানুষকে গান শোনাব।’

ঠাকুরগাঁওয়ের কোনো এক হাটে তাঁর কণ্ঠে যখন আধ্যাত্মিক গানের সুর ওঠে, কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় চারপাশের কোলাহল। গান শেষ হলে মানুষ ফিরে যান নিজেদের কাজে। আর খমক হাতে থেকে যান ছানু—পাঁচ দশক ধরে গান গেয়ে যাওয়া এক বাউল শিল্পী। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, কিন্তু তাঁর জীবনে এখনো কাটেনি অভাবের সুর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত