Ajker Patrika

দায়সারা বৃক্ষরোপণে চারায় মড়ক

  • দেওয়া হয়েছে দায়সারা বেড়া। নেই কোনো পরিচর্যা।
  • অনেক উপজেলায় তথ্যের সঙ্গে মিল নেই বাস্তবের।
  • তাহিরপুরে বরাদ্দ থাকলেও বৃক্ষরোপণের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
বিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ
দায়সারা বৃক্ষরোপণে চারায় মড়ক
রোপণ করা অনেক চারাই মারা গেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার চাঁনপুর-নয়াহালট সড়কে। ছবি: আজকের পত্রিকা

সরকারের ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির আওতায় সুনামগঞ্জে রোপণকৃত বেশির ভাগ বৃক্ষের চারা মরে যাচ্ছে। সঠিকভাবে চারা রোপণ না করা এবং পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চারাগুলো মরে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। এদিকে, যে পরিমাণ চারা রোপণের কথা, তাও লাগানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বন, বন্য প্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ নামে দেশব্যাপী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কর্মপরিকল্পনাসংক্রান্ত এক পত্রের তথ্য অনুযায়ী, পল্লী উন্নয়ন, সমবায় মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন বৃক্ষরোপণের চারা ক্রয় ও সংগ্রহ ২০০ টাকা, রোপণ ৫৩৩ টাকা, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ১০৫ টাকাসহ একটি গাছে সরকারের ব্যয় ৮৩৮ টাকা।

সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, জেলায় এ বছর ১০ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হবে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ১ হাজার, শান্তিগঞ্জে ১ হাজার, জগন্নাথপুরে ৫০০, দিরাইয়ে ৫০০ ও ছাতকে ২ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। তবে এলজিইডির এই তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

দিরাইয়ে উপজেলায় ৯৮৯টি গাছ লাগানোর কথা। কাগজপত্রে কুলঞ্জ ইউনিয়নের কুলঞ্জ গ্রামে ৫০০টি এবং ১৬৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন জাতের তিনটি করে মোট ৪৮৯টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে এ উপজেলায় বৃক্ষরোপণের গ্রহণযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

দিরাই উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাহিমা বেগম জানিয়েছেন, নিজস্ব খরচে বনজ, ফলদ ও ঔষধিসহ তিন জাতের বৃক্ষরোপণ করেছেন। সরকারের দেওয়া কোনো চারা পাননি তাঁরা।

দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, উপজেলায় পৃথক পৃথকভাবে গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় একাধিক দপ্তর সম্পৃক্ত আছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গাছ রোপণের বিষয়ে শিক্ষা অফিস বলতে পারবে।

কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, জামালগঞ্জের দুই সড়কে ২ হাজার চারা রোপণের কথা থাকলেও লাগানো হয়েছে ৫০০-এর কিছু বেশি। ২ হাজার বৃক্ষরোপণসংক্রান্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ৭৭ হাজার ২০০ টাকা। অপর এক পত্রে দুই সড়কে ৫০০টি বনজ, ফলদ ও ঔষধিসহ আরও গাছ রোপণ করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ টাকা। এদিকে, তাহিরপুরে বরাদ্দ থাকলেও বৃক্ষরোপণের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ সড়কের নয়াহালট-চাঁনপুর অংশে গিয়ে দেখা গেছে, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রোপণকৃত বেশির ভাগ চারা মরে গেছে। মশারিসদৃশ জাল দিয়ে দেওয়া হয়েছে বেড়া। এই অংশে রোপণকৃত গাছ গণনা করে প্রায় আড়াই শ পাওয়া গেছে। জামালগঞ্জ-নোয়াগাঁও সড়কের ঘাগটিয়া-ছোট ঘাগটিয়া অংশে রোপণকৃত গাছের অবস্থাও নাজুক।

জামালগঞ্জের চাঁনপুর গ্রামের প্রবীণ মো. হারুন মিয়া বলেন, ‘বেশির ভাগ গাছ মইরা তেজপাতা হইয়া গেছে। গাছ লাগাইয়া আর খবর নাই। এই কাজে জনগণ ও সরকারের কোনো উপকার হইতো না। মাঝপথে লাভ হইবো যারা রোপণ করছে তারার। সাধারণ মানুষ কিচ্ছু জানে না।’

কুলঞ্জ গ্রামের আফতাব চৌধুরী বলেন, ‘যতটুকু জানি পার্শ্ববর্তী তেতুইয়া-ইসলামপুর গ্রামে দেড়-দুই শ গাছ লাগানো হয়েছে। কুলঞ্জ গ্রামে এক বছরের মধ্যে কোনো গাছ লাগানো হয়নি।’

জামালগঞ্জ ছাড়াও একাধিক উপজেলা ঘুরে রোপণকৃত গাছে মড়ক অবস্থা লক্ষ করা গেছে।

সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জেলায় সর্বমোট ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হবে। এর মধ্যে ৫ হাজার রোপণ হয়েছে। বাকিগুলো কেন লাগায়নি জানতে চাওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, বিভিন্ন দপ্তর গাছ রোপণ করছে। বিভিন্ন সড়ক, জলমহাল, খালের পাশে গাছ রোপণ করা হবে। কতটি রোপণ হবে তা বন বিভাগ বলতে পারবে। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখা হবে।

সুনামগঞ্জ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ২৭ লাখ গাছ রোপণের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনো অনুমোদন হয়নি। গাছ রোপণের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখন বলা যাচ্ছে না।’

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সুনামগঞ্জের সদস্য সজল কান্তি সরকার বলেন, ‘গাছ লাগানোর পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবা হয় না। গাছ লাগিয়েই যেন কাজ শেষ। বৃক্ষরোপণের চেয়ে সংরক্ষণ ও পরিচর্যা বেশি জরুরি। আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ প্রেম নেই। বৃক্ষরোপণ কাদের দিয়ে কিভাবে করলে ভালো হবে সেটা করা হয় না। কোনো জবাবদিহি না থাকায় বৃক্ষরোপণেও অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত