Ajker Patrika

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল: ধান নিয়ে বিপাকে কৃষক

  • শ্রমিক, জ্বালানি ও যন্ত্রসংকটে ধান কাটায় ভোগান্তিতে কৃষক।
  • কোনো সংকট নেই বলে দাবি কৃষি অধিদপ্তরের।
  • জেলার ১৩৭ হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরে বোরো আবাদ।
  • গতকাল পর্যন্ত হাওরে ৩৭ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন।
বিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল: ধান নিয়ে বিপাকে কৃষক
জলাবদ্ধ মাঠে ধান কাটছেন দুই কৃষক। গত শুক্রবার সুনামগঞ্জের পাগনার হাওরের শান্তিপুর এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরের দুই লক্ষাধিক হেক্টর জমিনের পাকা ধান নিয়ে ত্রাহি অবস্থা কৃষকদের। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির পানি জমে ফলনের একটা অংশ আগেভাগেই নষ্ট হয়েছে। শেষমেশ শ্রমিক, জ্বালানি ও যন্ত্রের সংকট থাকায় অবশিষ্ট ধান কাটতেও নানা ঝক্কি-ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে বলে জানান তাঁরা। বিপরীতে কোনো সংকট নেই জানিয়ে ৮০ শতাংশ ধান পাকলে দ্রুত কাটার তাগিদ দিচ্ছে কৃষি অধিদপ্তর।

ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান হওয়ায় চেরাপুঞ্জির ভারী বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বরাবরই ঝুঁকিতে পড়ে। পাহাড়ি ঢল নেমে বোরো ফসলের ক্ষতি হয়। এর মাঝে চেরাপুঞ্জির ভারী বৃষ্টির ফলে নদ-নদীর পানি বাড়ায় কৃষকের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আগাম বন্যার শঙ্কা উল্লেখ করে দ্রুত ধান কর্তনের নির্দেশনা জারি করেছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

গত শুক্রবার হাওর ঘুরে দেখা যায়, দিরাই, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী এলাকা নিয়ে বিস্তৃত পাগনা হাওরের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ধান কাটা এখনো বাকি। হাওরের অনেক জায়গায় কৃষক-শ্রমিক উভয়ে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শ্রমিকসংকটে ধান কাটতে না পারার বিষয়টিও দৃশ্যমান ছিল। এর মাঝে হাতে গোনা কিছু হারভেস্টার যন্ত্র দিয়ে পাগনার হাওরে ধান কাটতে দেখা যায়। যদিও সাড়ে ৮ শতাধিক হারভেস্টার যন্ত্র এবং লক্ষাধিক শ্রমিক হাওরে ধান কাটছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিক ও জ্বালানিসংকটে নাজেহাল কৃষক এখনো ফসল রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ দিচ্ছেন।

পাগনার হাওরের লম্বা বাঁধ এলাকার জলমগ্ন জমিনে ধান কাটতে কাটতে কথা বলছিলেন শান্তিপুর গ্রামের কৃষক মো. মমিন মিয়া। উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই ধানই আমাদের বাঁচার অবলম্বন। সব তলাইয়া গেছে। এখন কাঁচা-পাকনা যা-ই আছে, তাই কাটার চেষ্টা করতাছি। ধান কাটার মানুষ নাই, মেশিনও নাই। খুব কষ্টের মধ্যে আছি।’

পাগনা হাওরের গঙ্গাধরপুর অংশে ধান কাটছিলেন ওই গ্রামের কৃষক রিপন সরকার। ১৫ বছর পর ধান কাটতে কাঁচি হাতে নিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই বছর আমরার নিজেরাই ধান কাটন লাগতাছে। বৃষ্টি-বাদলের কারণে মেশিন (ধান কাটার যন্ত্র) খেতে চলে না, ডাইব্যা (দেবে) যায়। শ্রমিকও কম, ভাই-বান্ধব লইয়া ধান কাটতাছি। এ ছাড়া তো রক্ষা নাই। এই ধানই আমরার একমাত্র পুঁজি।’

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ টন। আগাম বৃষ্টিতে প্রথম ধাপে ১২১ হেক্টর ও দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু কৃষক ও হাওর-সচেতন মানুষের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি। শ্রমিক ও জ্বালানিসংকটের কারণেও বেকায়দায় পড়েছেন কৃষক, এমন অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জের সাচনা বাজারের (পরিচয়ে অনিচ্ছুক) এক তেল বিক্রেতা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেল বিক্রিতে শক্ত সিন্ডিকেট কাজ করছে। যমুনা অয়েল কোম্পানির লোকজনকে হাত করে দূরদূরান্তে তেল বিক্রি করা হচ্ছে এখানে। সাচনা বাজারে ডিপো থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়রা তেল পাচ্ছে না। এমনকি খুচরা বিক্রেতা হিসেবে এজেন্সির কাছে এক ড্রাম ডিজেল চেয়েও পাইনি।

ভর্তুকিতে নেওয়া হারভেস্টার যন্ত্রের মালিক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘হারভেস্টার দিয়ে ঘণ্টায় দুই একর জমি কাটার কথা, কিন্তু পানি থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। পানিতে ধান কাটতে গিয়ে অনেক সময় যন্ত্রও বিকল হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।’

সাচনা বাজার যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মো. শাহজালাল বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী তেল ও ডিজেল এজেন্সিকে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন এই কার্যক্রম দেখভাল করছেন। এখানে তেল কিংবা ডিজেলের কোনো সংকট নেই। সিন্ডিকেট সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, গতকাল শনিবার পর্যন্ত হাওরে ৩৭ শতাংশ এবং নন-হাওরে (হাওরের বাইরে ছোট ছোট অংশ) ৫ শতাংশ ধান কর্তন করা হয়েছে। ভর্তুকির আওতায় ৬০২টি এবং ভাড়ায় ২৫০টির বেশি হারভেস্টার যন্ত্র ধান কাটায় সচল রয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ ১২ হাজারের মতো শ্রমিক ধান কর্তনে অংশ নিয়েছেন। হাওরে শ্রমিক, যন্ত্র কিংবা জ্বালানির কোনো সংকট নেই বলে জানান তিনি।

সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘২৮ এপ্রিল থেকে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। চেরাপুঞ্জিতেও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ মুহূর্তে সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আগাম বন্যার শঙ্কা রয়েছে। সে জন্য কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

হাত-পাবিহীন শিশুর জন্ম: বাবা বললেন ফেলে দিতে, হাসপাতাল করল বিল মওকুফ

দূরপাল্লার বাসযাত্রায় নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ, কোন রুটে কত বাড়ল

তেলপাম্পে মিছিল নিয়ে এসে ইউএনওর ওপর হামলা, অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থীকে খুন পূর্বপরিকল্পিত, খুনি রুমমেট: পুলিশ

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলে কাজ করতে হবে: মির্জা ফখরুল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত