Ajker Patrika

ঋণে জর্জরিত জেলেদের জীবনে নিষেধাজ্ঞা যেন অভিশাপ

মো. তামিম সরদার, পিরোজপুর
ঋণে জর্জরিত জেলেদের জীবনে নিষেধাজ্ঞা যেন অভিশাপ
নিষেধাজ্ঞা থাকায় নৌকা নিয়ে সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

পিরোজপুরে জেলে পল্লীর জেলেদের জীবন যেন নিরন্তর এক সংগ্রামের গল্প। দিনের পর দিন সাগরে কাটিয়ে, খেয়ে না খেয়ে চলে যায়। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও তাদের অভাব যায় না। একে তো কমেছে নদীর মাছ, তার পর রয়েছে জলদস্যুদের হানা, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি। ঋণের বোঝায় জর্জরিত এসব জেলেদের জীবনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তাই হয়ে ওঠে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।’

দীর্ঘ ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন ও উপার্জনহীন পিরোজপুরের জেলেরা। সরকারিভাবে যে চাল বরাদ্দ দেয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। সেই চালও আবার জোটেনা সব জেলের কপালে।

অচিরেই নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে কিন্তু জেলে জীবনে আলো ফিরতে আরও অনেকটা সময় লেগে যাবে। তত দিনে হয়তো ঋণের বোঝা বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। কেননা, নিষেধাজ্ঞা শেষে ট্রলার নিয়ে সাগরে গিয়ে ফিরে আবার আসতে আরও কমপক্ষে ১৫ দিন। এর মধ্যে ঝড়, বন্যা, বৈরী আবহাওয়া সবকিছু মোকাবিলা করে তীরে এসে মিলবে কাঙ্ক্ষিত মাছ। এ যেন এক দীর্ঘ অপেক্ষা!

সাগরগামী জেলে বেলাল বলেন, ‘২২ দিনের এই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞায় ২৫ কেজি চাল পায় জেলেরা। এত কম চালে ২২ দিন কাটানো অসম্ভব। চালের সঙ্গে ডাল, তরকারি, তেল, লবণ, মরিচ, মসলা কে দেবে? অনাহারে অর্ধাহারে জেলেদের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে আর সরকার শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যাচ্ছে। জেলেদের দেখার কেউ নাই।’

সাগরে মাছ ধরা জেলে ফরিদ জানান, ‘অবরোধে ভালো নেই জেলেরা। ঋণের বোঝায় জর্জরিত জেলে ও জেলে পরিবারের সদস্যরা। এনজিও থেকে টাকা তুলছে না এমন কোন জেলে নেই। নদীতে মাছ নেই, এর মধ্যে আবার নদী ও সাগরে নিষেধাজ্ঞা। যখন অবরোধ খুলবে তখন ঝড়ের আশঙ্কা আছে। জেলেরা কি করবে? ছেলে মেয়েদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা খরচ চালাতে পারছি না।’

নিষেধাজ্ঞা থাকায় নৌকা নিয়ে সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা
নিষেধাজ্ঞা থাকায় নৌকা নিয়ে সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

জেলে রাসেল জানান, অনেকেই ছেড়ে দিয়েছে এই পেশা। যারা আছে তারাও ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। কারণ এই পেশায় কোন লাভ নেই। জেলেরা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছে। সাগরে মাছ ধরতে গেলে মাছ পাওয়া যায় না। নিষেধাজ্ঞা, ঝড়, বন্যা, বৈরী আবহাওয়া সব মিলে জেলেদের দুর্দশা যেন প্রতিনিয়তই বেড়ে চলছে। আমরা সরকারের কাছে কম সুদে ঋণ চাই। ছেলেমেয়েদের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ চাই পড়াশোনার সুযোগ চাই।’

ট্রলার মালিক ইনসান বলেন, ২০০ লিটার জ্বালানি তেল আগে ২২ থেকে ২৪ হাজার টাকা ছিল এখন ২৯ হাজার টাকা। তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। ১৫ দিন সাগরে বসে মাছ ধরতে হয়। এর মধ্যে বৈরী আবহাওয়া এলে তীরে চলে যেতে হয়। এত ভোগান্তির পরেও ইলিশ ধরতে গিয়ে ইলিশ পাওয়া যায় না। জেলেদের পাশাপাশি ট্রলার মালিকদের জীবনও যেন চরম অনিশ্চয়তায় চলছে।

দক্ষিণ উপকূলীয় মৎস্য কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘জেলেরা সত্যি হতাশাগ্রস্ত। সবাই ঋণগ্রস্ত, সবারই সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। সরকারকে আহ্বান করব ২২ দিন অবরোধে ২৫ কেজি চাল নয়। এটি আরও বাড়ানো দরকার।’

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে পিরোজপুর জেলার ৭টি উপজেলায় ২০ হাজার ৯৪৫ জন সমুদ্রগামী নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে ৫২৩.৬২ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে।

পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত, বলেন, ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত জেলেদের ২২ দিনের অবরোধে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত