Ajker Patrika

ছিটমহল বিলুপ্তির ১২ বছর: পঞ্চগড়ে ৩৬ এলাকায় পরিবর্তনের ছোঁয়া

ফাহিম হাসান, পঞ্চগড়
ছিটমহল বিলুপ্তির ১২ বছর: পঞ্চগড়ে ৩৬ এলাকায় পরিবর্তনের ছোঁয়া
বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী নাগরিক সব সুবিধা পেলেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনো পিছিয়ে। ছবি: আজকের পত্রিকা

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর ১১ বছর পেরিয়ে ১২ বছরে পড়েছে বিলুপ্ত ছিটমহল। দীর্ঘ ৬৮ বছরের রাষ্ট্রহীনতার অবসানের পর পঞ্চগড় জেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ৩৬টি বিলুপ্ত ছিটমহলে এখন দৃশ্যমান হয়েছে নাগরিক অধিকার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

একসময় বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝখানে অবস্থান করেও কোনো দেশের নাগরিকত্ব ছিল না ছিটমহলবাসীর। ১৮ বছর বয়স পার হলেও তাঁরা ভোটাধিকার পেতেন না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাও ছিল না তাঁদের নাগালের মধ্যে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দারা বছরের পর বছর রাষ্ট্রহীন জীবন কাটিয়েছেন। দীর্ঘ আন্দোলন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে সেই অনিশ্চয়তার অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

চুক্তি বাস্তবায়নের পর পঞ্চগড় জেলার সঙ্গে যুক্ত হয় ৩৬টি বিলুপ্ত ছিটমহল। এর মধ্যে আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে গারাতি অন্যতম বড় ছিটমহল। গত ১১ বছরে এসব এলাকার চিত্রে এসেছে পরিবর্তন।

অধিকাংশ সড়ক এখন পাকা। বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছেছে এলাকায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবারও উন্নয়ন হয়েছে। গড়ে উঠেছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি ক্লিনিক। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাও পাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে একসময় রাষ্ট্রহীন মানুষগুলো এখন বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক। তাঁরা জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা ভোগ করছেন।

একসময় শিক্ষাই ছিল সবচেয়ে বড় সংকট। এলাকায় কোনো স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসা ছিল না। শিক্ষার্থীদের অনেক দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হতো, ফলে অনেকেই ঝরে পড়তেন। বর্তমানে বাড়ির কাছেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়ায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম দেশের অন্যসব এলাকার শিক্ষার্থীদের মতো সমান সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী নাগরিক সব সুবিধা পেলেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনো পিছিয়ে। ছবি: আজকের পত্রিকা
বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী নাগরিক সব সুবিধা পেলেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনো পিছিয়ে। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘একসময় আমরা কোনো দেশের নাগরিক ছিলাম না। এখন জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটাধিকারসহ সব নাগরিক সুবিধা পাচ্ছি। এটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’

একই এলাকার রহিমা বেগম বলেন, ‘আগে চিকিৎসার জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। এখন কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা আমাদের হাতের নাগালে এসেছে।’

সাইদুর রহমান বলেন, ‘আগে কাঁচা রাস্তার কারণে চলাচল ছিল খুবই কষ্টকর। এখন পাকা রাস্তা হওয়ায় যোগাযোগ সহজ হয়েছে, কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও সুবিধা হচ্ছে।’

তবে উন্নয়নের এ ধারার মধ্যেও কিছু অপূর্ণতা রয়েছে। তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে নির্মিত একটি ডিজিটাল সেন্টার এবং একটি পোস্ট অফিস দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এসব প্রতিষ্ঠান চালু হলে কর্মসংস্থান ও সেবাপ্রাপ্তি আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকুরিয়া পারভীন বলেন, ‘বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর জীবনমান উন্নয়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যেসব অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি বা কিছু উন্নয়নকাজ বাকি রয়েছে, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য, ছিটমহল এলাকার মানুষ দেশের অন্যসব অঞ্চলের নাগরিকদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত