সিরাজদিখানে হামলার শিকার বাবা-মেয়ের মৃত্যু, আটক ১

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে হামলায় পাঁচ বছরের শিশুকন্যা তোয়াবা আক্তারের মৃত্যুর এক দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা গোলাপ হোসেনেরও (৩২) মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোহরাব হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে বাবা-মেয়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গুরুতর আহত গোলাপ হোসেনকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুরের স্বদেশ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বেলা দেড়টার দিকে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদী গ্রামের একটি ইটভাটার পাশের পরিত্যক্ত জমি থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত গোলাপ হোসেনের বাড়ি লতব্দী ইউনিয়নের দোসরপাড়া গ্রামে। গতকাল বুধবার বিকেলে রামকৃষ্ণদী গ্রামের একটি ইটভাটায় কর্মরত তাঁর বাবা জয়নাল মিয়ার সঙ্গে দেখা করেন গোলাপ। পরে পাঁচ বছরের মেয়ে তোয়াবাকে নিয়ে সেখান থেকে শ্বশুরবাড়ি খাসকান্দির উদ্দেশে রাত ৮টার দিকে রওনা হন।
পথে রামকৃষ্ণদী বাজারে মেয়েকে নিয়ে চা পান করেন গোলাপ। এরপর পাথরঘাটা গ্রামে পৌঁছালে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি তাঁদের পথরোধ করেন। এ সময় গোলাপকে মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয় এবং তাঁর কাছ থেকে শিশুটিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে গোলাপ সেখান থেকে বাড়িতে পৌঁছান। পরে রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে তাঁর বাবা তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে দুর্বৃত্তরা শিশুটিকে হত্যা করে ইটভাটার পাশের একটি পরিত্যক্ত জমিতে ফেলে রেখে যায়।
গোলাপের পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রতিবেশী সোহরাব হোসেনের সঙ্গে তাঁদের জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
গোলাপের মা হাসু বেগম বলেন, সোহরাবদের সঙ্গে তাঁর ছেলের জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। সোহরাবকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ ঘটনা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. কামরান হোসেন বলেন, আজ সকাল ৯টার দিকে রামকৃষ্ণদী গ্রামের একটি ইটভাটায় শিশুর মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবর পেয়ে সিরাজদিখান থানা-পুলিশ ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে যায়। পরে শিশুটির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে জানা যায়, শিশুটি গোলাপ হোসেনের মেয়ে। পরে গোলাপের অবস্থান জানতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, তিনি আব্দুল্লাহপুরের স্বদেশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পুলিশের একটি দল সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, গোলাপ পুলিশকে জানায় বুধবার এশার নামাজের সময়ের দিকে মেয়েকে নিয়ে নিজ বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি খাসকান্দির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। পথে রামকৃষ্ণদী বাজারে মেয়েকে নিয়ে চা পান করেন। পরে পাথরঘাটা গ্রামে পৌঁছালে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কয়েকজন মুখোশধারী তাঁদের পথরোধ করে মারধর করেন এবং তাঁর মেয়েকে ছিনিয়ে নেন। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাবার বাড়িতে পৌঁছান।
মো. কামরান হোসেন আরও বলেন, গোলাপের বাবা তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে মারধর ও জোর করে বিষ খাওয়ানোর অভিযোগ করে তাঁকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের নথিতে বিষক্রিয়া ও শরীরে আঘাতের বিষয়টি উল্লেখ ছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর পেটের আঘাতের চিকিৎসা করা হয়। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে বলা হলেও ভোরের দিকে তিনি সেখান থেকে চলে এসে আব্দুল্লাহপুরের স্বদেশ হাসপাতালে ভর্তি হন।
কামরান হোসেন বলেন, স্বদেশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোলাপ পুলিশকে জানান, সোহরাব নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কয়েকজন মুখোশধারী তাঁর ও তাঁর মেয়ের ওপর হামলা চালায়। তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে সোহরাবকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার সময় তিনি কোথায় ছিলেন এবং অন্য কারও সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, গোলাপের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গে সোহরাবের জমিসংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা চলছে। এ বিরোধের জেরে উভয় পক্ষের কয়েকজনের কারাভোগের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
কামরান হোসেন জানান, আজ দুপুরের দিকে স্বদেশ হাসপাতালে গোলাপের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বেলা দেড়টার দিকে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হবে। অন্যদিকে তোয়াবার মরদেহের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কে বাদী হবেন, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে সিরাজদিখান থানা-পুলিশ ও জেলা ডিবি পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।









