Ajker Patrika

বিতাড়িত হওয়ার ২ বছর পর কলেজে ফিরলেন অধ্যক্ষ, লাঞ্ছিত হয়ে ফের বিদায়

মনিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি
আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ১৫
বিতাড়িত হওয়ার ২ বছর পর কলেজে ফিরলেন অধ্যক্ষ, লাঞ্ছিত হয়ে ফের বিদায়

গণ-অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের আন্দোলনের মুখে যশোর মনিরামপুরের রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে বিতাড়িত হন অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ। এরপর দুই বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও তিনি কলেজে ফিরতে পারেননি। গতকাল রোববার সকালে হঠাৎ কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষের চেয়ারে বসেন আব্দুল লতিফ। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বহিরাগত কয়েকজন এসে তাঁকে লাঞ্ছিত করে কলেজ থেকে বের করে দেন এবং তাঁর কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন।

কলেজের একটি সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের আন্দোলনের মুখে কলেজ ছাড়তে বাধ্য হন অধ্যক্ষ। এরপর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান কলেজের অপর শিক্ষক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান। সেই থেকে আব্দুল লতিফ বাড়িতে বসেই বেতন-ভাতা গুনছেন। সম্প্রতি কলেজে ল্যাব সহকারী পদে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। ২০২৭ সালের বছরের মাঝামাঝি সময়ে অফিস সহায়কের একটি পদও খালি হবে। কিন্তু অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেই নিয়োগ দিতে পারেন না। এই নিয়োগ সম্পন্ন করতেই অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফকে কলেজে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমি কলেজ সভাপতি মঈনুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করে কলেজে ফেরার আবেদন করি। সাত মাস পর ৮ সেপ্টেম্বর তিনি আমাকে একটি চিঠি দেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘‘কলেজে ফেরা না ফেরা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়’’। সভাপতির আপত্তি না থাকায় আমি গতকাল সকালে কলেজে যাই। শিক্ষকদের চিঠি দেখিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসি। দুপুর ১২টার দিকে ২০-৩০ জন লোক কলেজে এসে আমাকে বের করে দেন।’

আব্দুল লতিফ আরও বলেন, ‘বিষয়টি আমি সভাপতিকে জানালে তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে পরামর্শ না করে আপনি এভাবে কলেজে যাবেন কেন’’। এরপর আমি চলে এসেছি। কলেজের কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি।’

অধ্যক্ষ অভিযোগ করে বলেন, ‘কলেজে যাওয়ার আগে আমি রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক কামাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, ‘‘যেহেতু আপনার কাছে চিঠি আছে, আপনি কলেজে থাকেন।’’ পরে লোকজন এসে আমাকে বের করে দিতে চাইলে আমি কামাল হোসেনকে কল করি। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি।’

অধ্যক্ষের দাবির বিষয়ে ইন্সপেক্টর কামাল হোসেন বলেন, ‘তিনি (অধ্যক্ষ) একবার কল করেছিলেন, কিন্তু এসব বিষয়ে কথা হয়নি। তা ছাড়া আমি গতকাল স্টেশনে ছিলাম না। আদালতে কাজ ছিল। কলেজে অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিতের বিষয়ে কেউ জানায়নি। কোনো লিখিত অভিযোগও দেয়নি কেউ।’

এদিকে সভাপতি মঈনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ৮ সেপ্টেম্বর তারিখের একটি চিঠি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘গত ৪ মার্চ ২০২৬ আপনার পত্রের মাধ্যমে জানতে পারি আপনি বর্তমান অধ্যক্ষ পদে যোগদানের আবেদন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কলেজে পরিচালনা পর্ষদের সভা হয়েছে। তাতে জানতে পেরেছি, আপনি ২৯ আগস্ট ২০২৪ তারিখ থেকে অনিয়মিত ছুটি ভোগ করছেন। আপনার বিরুদ্ধে কয়েকটি ফৌজদারি মামলা আছে। এমন অবস্থায় আপনার যোগদান করা বা না করা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়।’

মামলার বিষয়ে অধ্যক্ষ লতিফ বলেন, ‘২০২৪ সালে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় শুনেছি আমার নামে একটি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো মামলা নেই।’ কলেজে নতুন নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শুনেছি নিয়োগ হবে। আমাকে কেউ বিস্তারিত জানায়নি।’

রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘গতকাল সকালে কলেজে পৌঁছানোর আগে শুনি আব্দুল লতিফ আমার চেয়ারে বসে আছেন। এরপর আমি কলেজে যাইনি। সভাপতিকে ফোনে বিষয়টি জানাই। পরে কলেজে কী হয়েছে, তা জানা নেই।’

এ বিষয়ে জানতে রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মঈনুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের অনুসারী ছিলেন। সেই ক্ষমতাবলে তিনি রাজগঞ্জ বাজার কমিটির শীর্ষ পদেও ছিলেন। রাজগঞ্জ বাজার ও কলেজে তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের রোষানলের কারণ হয়ে ওঠেন তিনি।

কলেজের একটি সূত্র বলছে, অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ একক সিদ্ধান্তে কলেজ পরিচালনা করলেও তখন কলেজে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ভালো ছিল। তাঁর বিদায়ের পর কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়েছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমানও। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের পর থেকে কলেজের এমন অবস্থা। এসব পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থী হাজিরা কমে গেছে। তবে পরীক্ষার সময় সবাই হাজির থাকেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত