Ajker Patrika

দেওয়ানগঞ্জে প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্প, তালিকা প্রকাশে গড়িমসি

এম কে দোলন বিশ্বাস, ইসলামপুর (জামালপুর)
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ১০
দেওয়ানগঞ্জে প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্প, তালিকা প্রকাশে গড়িমসি
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ খবিরুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ খবিরুজ্জামান খান। তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশীদ সাদার দাবি, সব প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

এদিকে, প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের তথ্যসংবলিত তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে পিআইওর বিরুদ্ধে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে যোগাযোগ করেও প্রকল্পের তালিকা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকে।

তালিকা প্রকাশ না করায় প্রকল্পের নাম, বরাদ্দের পরিমাণ, বাস্তবায়নস্থল ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ সদস্যদের পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকলে তালিকা প্রকাশে গড়িমসি কেন? আবার তালিকা প্রকাশ না করায় প্রকল্পের কাজের মান ও বরাদ্দের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার (ডিআরআরও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের কোটায় টেস্ট রিলিফ (টিআর) নগদ অর্থ কর্মসূচির আওতায় ৮৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই অর্থে ৫৩টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ কর্মসূচিতে পাঁচটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কাজের বিনিময়ে খাদ্যশস্য (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় ১২টি প্রকল্পের জন্য ৯৩ টন ৬০০ কেজি চাল ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই সূত্রে ৪৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিপরীতে সাতটি প্রকল্প নেওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

গত জুনের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে জেলা পর্যায় থেকে প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়। জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, গত ৩০ জুন প্রকল্পগুলোর মেয়াদ শেষ হয়।

সরেজমিনে সাইনবোর্ডের তথ্য পাওয়া যায়নি

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে কমিটির সভাপতির নাম ও বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ করে প্রতিটি প্রকল্পস্থলে সাইনবোর্ড স্থাপনের বিধান থাকলেও অনেক প্রকল্পে তা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড না থাকা এবং প্রকল্পের তালিকা প্রকাশ না করায় কোথায়, কখন ও কত টাকার কাজ হয়েছে, কিংবা কারা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন—এসব তথ্য জানা কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজান, আকবর, হেলাল ও আফছানা জানান, সরকারি বরাদ্দের তথ্য জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। কিন্তু পিআইও প্রকল্পের তালিকা প্রকাশ করছেন না। কোথায় কত টাকার কাজ হয়েছে, তা-ও এলাকাবাসী জানেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গণমাধ্যমকর্মী জানান, তাঁরা বারবার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে প্রকল্পের তালিকা চাইলেও তা পাননি। বিষয়টি ইউএনওকে জানানো হলে তিনি পিআইওকে তালিকা সরবরাহের নির্দেশ দেন। তবে এরপরও তালিকা পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। পরে বাধ্য হয়ে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় নির্ধারিত ফরমে আবেদন করা হয়েছে।

সব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার দাবি পিআইওর

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব ও অভিযুক্ত পিআইও মোহাম্মদ খবিরুজ্জামান খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত ৩০ জুনের আগেই সব প্রকল্পের কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাড়ে তিন মাস পরও তালিকা প্রকাশ না করার কারণ জানতে চাইলে খবিরুজ্জামান বলেন, তালিকা প্রকাশ করা হবে।

কবে নাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হবে, জানতে চাইলে খবিরুজ্জামান মুচকি হেসে বলেন, ‘সময় হলেই তালিকা প্রকাশ করব।’

তালিকা প্রকাশের দায়িত্ব পিআইওর: ইউএনও

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও ইউএনও শাহ্ জহুরুল হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পের তালিকা প্রকাশ করার দায়িত্ব পিআইওর। তালিকা না দেওয়ার বিষয়ে জেলার দুজন গণমাধ্যমকর্মী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাৎক্ষণিকভাবে পিআইওকে প্রকল্পের তালিকা দিতে বলেছি। প্রতিটি প্রকল্পস্থলে প্রকল্পের যাবতীয় তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে।’

তথ্য প্রকাশ না করা নিয়ে প্রশ্ন

জামালপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, প্রকল্পের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ না করাটাও দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। সরকারি বরাদ্দের জবাবদিহি না থাকলে দুর্নীতি হ্রাস করা সম্ভব হবে না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী মুহাম্মদ মানিক মিয়া বলেন, সরকারি বরাদ্দের কাজ শুরুর আগেই প্রতিটি প্রকল্পস্থলে প্রকল্পের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। প্রকল্পের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ না করাটা অপরাধ। সরকারি বরাদ্দের তথ্য পেতে হয়রানির শিকার হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার রাখেন।

প্রকল্পের তালিকা প্রকাশ না করার অভিযোগের বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহেল কাফি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

দেওয়ানগঞ্জে প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্প, তালিকা প্রকাশে গড়িমসি