Ajker Patrika

সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্ব: প্রতিপক্ষ সরাতে ভাড়াটে খুনি ব্যবহার সন্ত্রাসীদের

  • রাজধানীতে কয়েকটি হত্যা, হামলায় ছিল ভাড়াটে শুটার
  • নিজেদের আড়ালে রাখতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এই কৌশল
  • পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে
শাহরিয়ার হাসান, ঢাকা 
সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্ব: প্রতিপক্ষ সরাতে ভাড়াটে
খুনি ব্যবহার সন্ত্রাসীদের
প্রতীকী ছবি

রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিতে নতুন কৌশল নিয়েছে। তারা প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে ভাড়াটে খুনি বা আহত করতে ভাড়াটে সন্ত্রাসী ব্যবহার করছে। তাদের এই কৌশল নিজেদের আড়ালে রাখার জন্য।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভারতের অপরাধীদের মতো ‘সুপারি দেওয়া’য় হত্যার পরিকল্পনাকারী শনাক্ত করা এবং অপরাধের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া কঠিন হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে হত্যা, হামলা ও গুলিবর্ষণের কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত বাড়লেও হামলাগুলোতে তাদের পরিচিত সহযোগীদের দেখা যায়নি; বরং ভিন্ন এলাকার ভাড়াটে খুনি ও শুটারদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া অনেকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী দলের পূর্ব পরিচয়ের তথ্যও মিলছে না। ফলে নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার রামপুরায় নিজের বাসার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন একসময়ে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ। তিনি ‘কাইল্লা পলাশ’ নামেও পরিচিত। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার এক মাসের মাথায় তিনি গুলিবিদ্ধ হলেন। তাঁর মাথায় দুটি গুলি করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় হেলমেট ও মাস্ক পরা দুই ব্যক্তি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, হামলাকারীরা পেশাদার ভাড়াটে শুটার। কারণ, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। সন্দেহভাজন প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসী দলের পরিচিত সহযোগীদের সঙ্গেও তাঁদের মিল পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে একে একে জামিনে মুক্তি পান কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকার ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, মিরপুরের আব্বাস আলী এবং তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামও রয়েছেন।

পাশাপাশি বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক ৪২৬ জন সন্ত্রাসীও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মুক্তি পান। মুক্তির পর তাঁদের অনেকে পুরোনো অপরাধী চক্র পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার হন শীর্ষ সন্ত্রাসী ত্রিমাতি সুব্রত বাইন।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কয়েকজন মুক্তির পর রাজধানীতে একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারে জোড়া খুনের ঘটনায় নতুন করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সংঘাত প্রকাশ্যে আসে। ওই ঘটনায় করা মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন পিচ্চি হেলাল, রায়েরবাজারের কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন হোসেন। ইমনকে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

গত ২৮ এপ্রিল বছিলার অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে নিউমার্কেট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। এ ঘটনায় পিচ্চি হেলাল, কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান এবং ড্যাগারি রনির নাম বিভিন্নভাবে আলোচনায় আসে।

এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আদালতপাড়ার কাছে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। গত বছরের ১৯ এপ্রিল হাতিরঝিলে যুবদল নেতা আরিফ সিকদার হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে নাম শোনা যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের।

এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে। কয়েকটি অস্ত্রও উদ্ধার করেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে হামলার পরিকল্পনাকারীরা অধরা থেকে গেছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক শুটার ও হামলাকারীর সঙ্গে মূল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। ফলে নেপথ্যের নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডগুলোর ধরনে বেশ মিল রয়েছে। হামলাকারীরা সাধারণত মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে এবং গুলি করে কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করছে। আগে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নিজেদের দীর্ঘদিনের সহযোগী বা গ্রুপের সদস্যদের দিয়ে হামলা চালাত। কিন্তু বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এবং নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে বাইরের লোকজনকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করছে। এতে হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হলেও পরিকল্পনাকারীদের পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী এবং তাদের সহযোগীদের তালিকা করা হয়েছে। খুব শিগগির তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী হিসেবে অন্তত ৮৭ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় ওই তালিকাভুক্তদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া সন্ত্রাসীরা আবার অপরাধে জড়াচ্ছেন কি না, তা নজরদারিতে রাখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হয়, তাদের কার্যকর নজরদারির মধ্যে রাখা যায়নি। অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি এবং সাম্প্রতিক অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা ক্ষুদ্র সন্ত্রাসী বলে কিছু নেই। কেউ অপরাধ করলে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে, সে যে-ই হোক।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত