Ajker Patrika

‘গুপ্ত’ ইস্যু: ছোট শব্দে বড় রাজনীতি

  • ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি অবস্থানের পেছনে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ।
  • ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আগে অবস্থান পোক্ত করতে চাইছে উভয় পক্ষ।
  • ক্যাম্পাসের অস্থিরতায় জাতীয় রাজনীতির ছায়া দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
রাহুল শর্মা, ঢাকা 
‘গুপ্ত’ ইস্যু: ছোট শব্দে বড় রাজনীতি
ফাইল ছবি ।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তুলনামূলক শান্ত থাকা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও পাবনায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আপাত-দৃষ্টিতে ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করে বিরোধের প্রকাশ ঘটলেও এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। দুই সংগঠনের নেতা-কর্মী, শিক্ষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় রাজনীতির জটিল সমীকরণ, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার এবং আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচন —এই তিন কারণ ‘শান্ত’ ক্যাম্পাসকে ‘অশান্ত’ করে তুলেছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২১ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি কলেজে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির একটি গ্রাফিতি আঁকে, যেখানে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। পরে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ‘ছাত্ররাজনীতি’ থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দিয়ে তার ওপর ‘গুপ্ত’ শব্দ লিখে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দুই দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে দুই পক্ষই দাবি করেছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যাঁরা প্রকাশ্যে এসেছেন, তাঁদের অনেকে আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন—এমন অভিযোগ ঘিরেই ‘গুপ্ত’ শব্দটি আলোচনায় আসে। ছাত্রদলের অভিযোগ, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও শিবিরের হল কমিটিসহ অন্যান্য কমিটিগুলো ঘোষণা করা হয়নি, যা গুপ্ত রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২৩ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর ফটোকার্ড ছড়ানোকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ থানা এলাকায় আবারও সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। সবশেষ গত শুক্রবার রংপুর মেডিকেল কলেজের আবাসিক হলে সিট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ছাত্রসংগঠনগুলোর অভিভাবক রাজনৈতিক দলের নেতারাও পরস্পর বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা ছড়িয়েছে রাজপথ ও সংসদেও।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি শব্দকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও বাস্তবে এটি বড় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। জাতীয় রাজনীতির প্রভাব, সংগঠনগত শক্তি প্রদর্শন এবং ভবিষ্যৎ ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলছেন, সংস্কার ও ‘জুলাই সনদ’ ইস্যুতে ইতিমধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো মাঠে সক্রিয়, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের শক্তির মধ্যে অনেক শক্তিই ভেবেছিল তারা ক্ষমতায় আসবে। যারা প্রত্যাশিত ভোট পায়নি তারা মনে করছে, এই সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে পারলে তাদের জন্য ক্ষমতায় আসা সহজ হবে। এখন আমরা যাদের অনুঘটক হিসেবে দেখছি, তাদের বাইরেও দেশি-বিদেশি শক্তি থাকতে পারে।’

এই অধ্যাপক আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেই পরিবর্তনের আগের অনুঘটকও ফ্যাক্টর হিসেবে রয়ে গেছে। তাদের নিষিদ্ধ করা হলেও তাদের বিচারও কিন্তু সেভাবে হয়নি।

একাধিক ছাত্রসংগঠনের নেতা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতে, ৫ আগস্টের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাফল্যের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে ছাত্রশিবির। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ছাত্রদল কিছুটা চাপে ছিল। বিএনপি সরকার গঠনের পর সেই অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে চায় সংগঠনটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ৫ আগস্টের পর ‘ব্যাচ প্রতিনিধি’ পদ্ধতির মাধ্যমে শিবির হলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরে ডাকসু নির্বাচনে এসব প্রতিনিধিরা শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে অংশ নিয়ে জয়ী হন। এতে হলভিত্তিক রাজনীতিতে ছাত্রদল পিছিয়ে পড়ে। এখন তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল বলেন, ক্যাম্পাস দখলকে কেন্দ্র করে দুটি দল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর শিবির করেছে, আর এখন ছাত্রদল করছে। এ কারণেই মূলত ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন আজকের পত্রিকাকে বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল হওয়ার মূল কারণ শিবিরের ‘গুপ্ত’ রাজনীতি। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের বট আইডির মাধ্যমে তারা ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করে চলছে।

তবে ছাত্রদলকে উদ্দেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের আন্তর্জাতিক সম্পাদক সাদিক কায়েম বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের অন্যান্য সমস্যাগুলোকে (তেল সংকট, আইনশৃঙ্খলা) ঢাকতে তারা এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। ডাকসুর পক্ষ থেকে ক্যাম্পাস স্থিতিশীল রাখতে আমরা সচেষ্ট আছি।’

এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচন ঘিরেও রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। ছাত্রশিবির চায় তাদের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে, আর ছাত্রদল চায় হলভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাকসুর মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি এবং শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই ছোট ছোট ইস্যুকে বড় করে তোলা হচ্ছে। সম্ভাব্য নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার, অবস্থান শক্ত করা এবং সমর্থন বাড়ানোর লক্ষ্যেই আগাম শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ জন্যই ছোটখাটো ইস্যুকে সামনে রেখে সক্রিয় অবস্থানে তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ক্যাম্পাস অস্থিতিশীলতার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে জাতীয় রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়—এ বাস্তবতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

দূরপাল্লার বাসযাত্রায় নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ, কোন রুটে কত বাড়ল

হাত-পাবিহীন শিশুর জন্ম: বাবা বললেন ফেলে দিতে, হাসপাতাল করল বিল মওকুফ

তেলপাম্পে মিছিল নিয়ে এসে ইউএনওর ওপর হামলা, অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা

জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলে কাজ করতে হবে: মির্জা ফখরুল

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থীকে খুন পূর্বপরিকল্পিত, খুনি রুমমেট: পুলিশ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত