Ajker Patrika

গ্যাস-সংকট: আয়ে টান সিএনজিচালকদের, যাত্রীরা গুনছেন বাড়তি ভাড়া

  • গ্যাস সংগ্রহের জন্য ফিলিং স্টেশনে সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি।
  • আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানালেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৩৩
গ্যাস-সংকট: আয়ে টান সিএনজিচালকদের, যাত্রীরা গুনছেন বাড়তি ভাড়া
ছবি: সংগৃহীত

গ্যাসের চলমান তীব্র সংকটে আয়ে টান পড়েছে সিএনজিচালিত যানবাহন, বিশেষ করে অটোরিকশার চালকদের। গ্যাস সংগ্রহ করতে ফিলিং স্টেশনে কয়েক ঘণ্টা লেগে যাওয়ায় যাত্রী পরিবহনে সময় কম পাচ্ছেন। যে টাকা আয় হচ্ছে তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। এই সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে অনেক চালকের বিরুদ্ধে।

সাগরে ভাসমান দুই এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের পর গত মঙ্গলবার থেকে বন্ধ হওয়ার পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে শুরু হওয়া তীব্র গ্যাস-সংকটে গতকাল সোমবারও ভুগেছেন পাইপলাইনের গ্যাসের গ্রাহকেরা। বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। ফিলিং স্টেশনে সিএনজির জন্য অপেক্ষার সময় বেড়েছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমায় বেড়েছে লোডশেডিং। শুক্রবার থেকে সেই ত্রুটি সারানোর কাজ চলছে।

একটি এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির পর থেকে দৈনিক চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, এলএনজি সরবরাহে ব্যবহৃত বন্ধ টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে প্রায় দুই সপ্তাহ প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি। প্রতিষ্ঠানটি এ কাজ শেষ করার জন্য আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আগামী সপ্তাহে গ্যাস-সংকট পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আগামী সপ্তাহে ৫০ শতাংশ সরবরাহ চালু করতে পারলে পরের সপ্তাহে ১০০ শতাংশ করতে পারবে। সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস-সংকট পরিস্থিতি উত্তরণে সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি বাসাবাড়িতে মা-বোনেরা, গৃহিণীরা সংসারের রান্নার কাজে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। এ কারণে আমরা জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে এটি সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি নয়, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আমরা তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্নের কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ফলে মঙ্গলবার থেকে যানবাহনগুলোকে গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য অটোরিকশা, সিএনজিতে চলা গাড়ির দীর্ঘ সারি রাত-দিন লেগেই আছে। হিউম্যান হলারও আছে সারিতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরে ১৫ হাজার ৬৯৬টি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চলাচলের অনুমোদন রয়েছে। এসব অটোরিকশার চালকেরাই বর্তমানে গ্যাস-সংকটে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।

অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ মিল্লাত আজকের পত্রিকাকে বলেন, গ্যাস-সংকট শুরু হওয়ার পর নিয়মিত অটোরিকশা চালাতে পারছেন না। দু-এক দিন গ্যাস পেলেও ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা সময় লাগছে। যে গ্যাস পাচ্ছেন, তা দিয়ে খরচ মিটিয়ে নিজের কিছু থাকছে না। অটোরিকশা চালালেই সংসার চলে, না চালালে চলে না। খুব সংকটের মধ্যে আছেন।

গ্যাস-সংকটের কারণে অটোরিকশার সংকট তৈরি হওয়ায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। বেসরকারি চাকরিজীবী আবু হাসান নামের এক যাত্রী বলেন, গণপরিবহনে কোনো সংকট নেই। তবে অটোরিকশা কম পাওয়া যাচ্ছে। যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো আগের তুলনায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি ভাড়া চাচ্ছে। অজুহাত দিচ্ছে গ্যাস পাচ্ছে না।

বাড়তি ভাড়া নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে অটোরিকশাচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, গ্যাস নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও দীর্ঘ সময় সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে অল্প গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। গ্যাসের চাপও কম। সারা দিন অপেক্ষা করে গ্যাস নিতে হচ্ছে। এই গ্যাস দিয়ে বেশি চলা যাচ্ছে না, তাই বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, রামপুরা থেকে কল্যাণপুর পর্যন্ত আগে যেখানে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন গ্যাস-সংকটের কারণে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, ২০১৫ সালের পর পাঁচ দফা সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়লেও অটোরিকশার ভাড়া সে অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়নি। বর্তমানে চালকদের ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করে গ্যাস নিতে হচ্ছে। এতে দৈনিক ট্রিপ ও আয় কমে যাওয়ায় অনেক চালক মালিকের জমা দিয়েই খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন। অনেক স্টেশনে গ্যাস না থাকার কথা বলা হলেও একই সময়ে বড় সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে। চালকেরা যে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন, তার বেশির ভাগই আয় কমে যাওয়ার ক্ষতি পোষাতে ব্যয় হচ্ছে।

এদিকে রাজধানীতে ৪ থেকে ৫ হাজার বাস চলাচল করে। এর মধ্যে সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যা খুব কম। অধিকাংশ বাস ডিজেলচালিত হওয়ায় গ্যাস-সংকটের প্রভাব বাস চলাচলে তেমন পড়ছে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ঢাকা শহরে সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যা খুব কম। মোট বাসের মধ্যে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ (০.৫ %) সিএনজিচালিত হতে পারে। তাই বর্তমান গ্যাস-সংকটের কারণে বাসে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না। এ বিষয়ে তাঁদের কাছে উল্লেখ করার মতো কোনো অভিযোগও আসেনি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তারাও বলছেন, বর্তমানে ঢাকা শহরে অধিকাংশ বাসই ডিজেলচালিত।

অটোরিকশায় বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গ্যাস-সংকটকে পুঁজি করে কোনো চালক বা পরিবহন যদি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে, তাহলে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করতেই পরিবহনে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন শুধু পরিবহনমালিকদের নয়, নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে। তাই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানিনির্ভর গণপরিবহন সম্প্রসারণের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত