Ajker Patrika

অপ্রতীমের বন্ধুরা ছিল ‘বয়সে বড়’, আইফোনের জন্যই হত্যাকাণ্ড: পুলিশ

  • আইফোনের জন্যই এ হত্যাকাণ্ড ও উদ্ধার
  • দুই অপ্রাপ্তবয়স্কসহ গ্রেপ্তার ৩, হেফাজতে আরও একজন
  • জানাজা ও দাফন সম্পন্ন
  • বিচার দাবিতে কুবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ, কুমিল্লা 
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ৫৭
অপ্রতীমের বন্ধুরা ছিল ‘বয়সে বড়’, আইফোনের জন্যই হত্যাকাণ্ড: পুলিশ
অপ্রতীম। ছবি: সংগৃহীত

বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম। সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর বন্ধুত্ব ছিল নিজের বয়সী সহপাঠীদের গণ্ডি পেরিয়ে বয়সে অনেক বড় ও পাড়ার কিছু তরুণের সঙ্গে। যাদের সঙ্গে সে একসঙ্গে টিকটক ভিডিও তৈরি করত, সেই বন্ধুদের বিরুদ্ধেই এবার উঠেছে তাকে হত্যার অভিযোগ।

এ ঘটনায় দুজন অপ্রাপ্তবয়স্কসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার ও আরও এক তরুণকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মোবাইল দিতে বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়।

আজ রোববার দুপুরে কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, অপ্রতীমের সঙ্গে তার বন্ধুদের বয়সের উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ছিল। তাদের সঙ্গে অপ্রতিমের বন্ধুত্ব ও মেলামেশার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের দাবি, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়।

গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতীম। ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উৎকণ্ঠায় রাত কাটে পরিবারের। পরদিন গতকাল শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ঘেঁষা জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের খবরে কুমিল্লাজুড়ে নেমে আসে শোক ও ক্ষোভ।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন মা-বাবা। হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে আজ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে নামেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার যারা

ঘটনার এক দিনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।

জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) ও ১৫ বছর বয়সী দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া সিয়াম (১৯) নামের আরও একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে।

যেভাবে উদ্ধার হলো সেই আইফোন

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার নিজ বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতীম। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, এরপর রাত—অপ্রতীমের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে ওই দিনই সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অপ্রতীমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।

নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশ অপ্রতীমের সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিবারের সন্তান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাসেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর প্রায় ২১ ঘণ্টা পর গতকাল দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়।

পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত শুক্রবার বেলা আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে সাইফুল ইসলাম তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে যান। গতকাল দুপুরে ওই এলাকা থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন।

এরপর তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানোমতে তাঁর বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয় বলে জানায় পুলিশ।

এ ছাড়া তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ১৫ বছর বয়সী দুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পায়। পরে প্রথমে একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের ভিত্তিতে তার আরও এক বন্ধুকে হেফাজতে নেওয়া হয়।

কী কী ঘটেছিল—যা জানাল পুলিশ

পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদ ও উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এ ঘটনায় আটক সিয়ামের ভূমিকা ও হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা এখনো তদন্তাধীন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাতে পুলিশ সুপার জানান, গত শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এ সময় অপ্রতীম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন ও পরে গ্রেপ্তার অন্য দুজন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় আঘাত করে। অপ্রতীমের মৃত্যু হওয়ার পর তুহিন মোবাইল ফোন নিয়ে গ্রেপ্তার দুজনসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

বয়সের ব্যবধানে বন্ধুত্ব নিয়ে পুলিশের ভাষ্য

অপ্রতীমের বন্ধুদের সঙ্গে বয়সের ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, নিহত অপ্রতীমের সঙ্গে তার বন্ধুদের বয়সের উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতীমের বন্ধুত্ব ছিল তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় ও পাড়ার কিছু বখাটে ছেলের সঙ্গে। তারা একসঙ্গে টিকটক ভিডিও তৈরি করত।

পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সন্তানদের বন্ধুত্ব, মোবাইল, ডিভাইস, চলাফেরা ও মেলামেশার বিষয়ে প্রত্যেক মা-বাবাকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

তবে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কিংবা কোনো বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

পুলিশ সুপার জানান, গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর। তিনি সদর দক্ষিণ থানার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা (মৈশান বাড়ি) এলাকার নুরে আলম ও শিরিনা আক্তারের ছেলে।

পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন।

এ ছাড়া সদর দক্ষিণ থানার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার ১৫ বছর বয়সী ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী একজন ও কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া কালিবাজার এলাকার ১৫ বয়সী একজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়।

এ ছাড়া আটক সিয়ামের বয়স ১৯ বছর। তিনি সদর দক্ষিণ থানার এলাহীপুর এলাকার সেলিম মিয়া ও শিরিনা আক্তারের ছেলে। তিনি কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার দৌলতপুর এলাকার আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

এদিকে হত্যার বিচার, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারসহ চার দফা দাবিতে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।

পরে জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এর আগে অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় আসামিদের অজ্ঞাতনামা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

মায়ের কর্মস্থল থেকে শেষবিদায়

আজ সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতীমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বজন ও স্থানীয় লোকজন অংশ নেন। বেলা ১১টার দিকে গন্ধমতি এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতীমকে দাফন করা হয়।

অপ্রতীম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার একজন ব্যবসায়ী।

প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইশতিয়াক হাসান আমীন, মো. জিয়াউর রহমান, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহসহ পুলিশের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত