Ajker Patrika

৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পাস, কাঠমিস্ত্রি নাসিমুলের স্বপ্নজয়ের গল্প

আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পাস, কাঠমিস্ত্রি নাসিমুলের স্বপ্নজয়ের গল্প
কাঠমিস্ত্রি নাসিমুলের দৃষ্টান্ত এখন অনেকের কাছেই অনুকরণীয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

দীর্ঘ দুই যুগ আগে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে ছেড়ে দিতে হয়েছিল লেখাপড়া। এরপর জীবিকার তাগিদে কাঠমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সংসার বড় হয়েছে, একে একে এসেছে তিন সন্তান। জীবনের ব্যস্ততায় পড়াশোনায় আর ফেরা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু মনের গভীরে লেখাপড়ার ইচ্ছেটা ঠিকই বেঁচে ছিল।

দিনভর কাঠ কাটা, কাঠে নকশা করা, নানা ধরনের আসবাবপত্র তৈরি শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরা। পরিবার ও পেশাগত দায়িত্ব সামলানোর পরও পড়াশোনায় ফেরার স্বপ্ন তাঁকে কেবলই তাড়িয়ে বেড়াত। সেই স্বপ্ন পূরণে ৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার মো. নাসিমুল হক।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জানা যায়, রাজশাহী কমার্স কলেজ (ভোকেশনাল) থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ—৪.৬২ পেয়েছেন। তাঁর এই সাফল্যে পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।

নাসিমুল হক ভোলাহাট উপজেলার গোহালবাড়ী ইউনিয়নের সুরানপুর তিলোকী গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় কাঠমিস্ত্রি হলেও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। বর্তমানে তিনি ভোলাহাট উপজেলা ফার্নিচার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নাসিমুল হক জানান, সংসার চালাতে সারাদিন কাঠের নকশা ও বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। ২০০২ সালে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। এরপর আর পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। তবে মনের মধ্যে পড়াশোনা করার অদম্য ইচ্ছা সবসময়ই ছিল। সেই স্বপ্ন থেকেই আবার ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করি। আজ ফল হাতে পেয়ে খুব ভালো লাগছে।’

সংসারের দায়িত্ব ও পেশাগত ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বয়সকে বাধা মনে করেননি নাসিমুল। বরং নিজের সন্তানদেরও পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে এবং তাঁদের কাছে একটি উদাহরণ তৈরি করতেই নতুন করে বই—খাতা হাতে নেন তিনি।

নাসিমুল হক বলেন, ‘আমার এক মেয়ে ও দুই ছেলে। আমি চাই, তারা পড়াশোনা করে জীবনে ভালো কিছু করুক। সন্তানদেরও বোঝাতে চাই—ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে বয়স কোনো বাধা নয়। যে কোনো বয়সেই নতুন করে শুরু করা যায়।’

এসএসসি পাস করেই থেমে যেতে চান না নাসিমুল। আরও পড়াশোনা করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি নিজের পেশা ও শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্বও চালিয়ে যেতে চান তিনি।

তাঁর এই অর্জনকে অনুপ্রেরণাদায়ক বলে মনে করছেন স্থানীয়রাও।

স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী জামিল হোসেন বলেন, ‘আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেই কাজের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব সামলে ৪৫ বছর বয়সে পড়াশোনা করে এসএসসি পাস করা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর এই সাফল্য এলাকার অন্যদেরও নতুন করে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করবে।’

ভোলাহাট উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. লোকমান আলী বলেন, ‘সংসারের দায়িত্ব পালন করে একজন মানুষ ৪৫ বছর বয়সেও পড়াশোনা করে ভালো ফল করতে পারেন—নাসিমুল হক তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর এই অর্জনে আমরা আনন্দিত এবং তাঁকে অভিনন্দন জানাই।’

গোহালবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলী বলেন,‘তরুণদের জন্য নাসিমুল হক অনুকরণীয়। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ইচ্ছা থাকলে যে কোনো বয়সে লেখাপড়া করে সনদ অর্জন করা সম্ভব। তাঁর একান্ত ইচ্ছা ও প্রচেষ্টাই তাঁকে এতদূর নিয়ে এসেছে।’

নাসিমুলের গল্প তাই শুধু ৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পাস করার গল্প নয়। এটি মাঝপথে থেমে যাওয়া একজন মানুষের স্বপ্নকে আবারও আঁকড়ে ধরার গল্প-- বাধার পাহাড় ডিঙিয়েও যে স্বপ্ন পূরণ করা যায়। সংসার, সন্তান ও পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার জন্য বয়স কোনো দেয়াল নয়; প্রয়োজন শুধু নতুন করে শুরু করার সাহস, ইচ্ছা আর নিরন্তর চেষ্টা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত