Ajker Patrika

বগুড়ার সারিয়াকান্দি: যমুনায় বিলীন শতবর্ষী স্কুল, টিনের ছাউনিতে পাঠদান

  • ষষ্ঠবারের মতো ভাঙনের শিকার চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
  • শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ না করতেই অস্থায়ী এই ব্যবস্থা: প্রধান শিক্ষক
গনেশ দাস, বগুড়া 
আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ১০: ২১
বগুড়ার সারিয়াকান্দি: যমুনায় বিলীন শতবর্ষী স্কুল,
টিনের ছাউনিতে পাঠদান
যমুনায় বিলীন হয়েছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ঝরে পড়া রোধে পাশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর টিনের ছাউনি দিয়ে চলছে পাঠদান। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর টিনের ছাউনি দেওয়া একটি খোলা ঘরে গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলা ক্লাস চলছিল। সেখানে কোথাও দরজা নেই, জানালা নেই। নেই শিক্ষকদের বসার আলাদা কক্ষ, নেই অফিস ও শৌচাগার। হঠাৎ বাতাস জোরে বইলে টিনের ছাউনি কেঁপে ওঠে। বৃষ্টি নামলে থেমে যায় পাঠদান, ভিজে যায় বই-খাতা। এটাই এখন বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

১০৭ বছরের ইতিহাস বহন করা বিদ্যালয়টির পাকা ভবন গত মে মাসে যমুনার ভয়াল ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ষষ্ঠবারের মতো নদীভাঙনের শিকার হলো বিদ্যালয়টি। শিক্ষকেরা নিজেদের উদ্যোগে বাঁধের ওপর টিনের ছাউনি তুলে শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। নদী শুধু ভবন নয়, আশপাশের বাড়িঘর থেকে শুরু করে কেড়ে নিয়েছে শিক্ষার পরিবেশও।

১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসময় ছিল যমুনাপারের কয়েকটি গ্রামের শিশুদের শিক্ষার প্রধান ভরসা। চকরতিনাথ, করমজাপাড়া, ধনেরপাড়া, কর্নিবাড়ি, শিমুলবাড়িসহ আশপাশের গ্রামের শত শত শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করত। কিন্তু বছরের পর বছর নদীভাঙনে গ্রাম হারিয়েছে, বসতভিটা হারিয়েছে মানুষ। পরিবারগুলো একের পর এক অন্যত্র সরে যাওয়ায় কমেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ১০ বছর আগেও শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৫০০। কিন্তু এখন শিক্ষার্থী মাত্র ৭৩ জন।

সুজাতপুর চরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে ছোট ছোট শিশু কয়েক কিলোমিটার হেঁটে নদীর ঘাটে আসে। এরপর খেয়ানৌকায় যমুনা পার হয়ে আবার হেঁটে পৌঁছায় বিদ্যালয়ে। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকলে সেই যাত্রা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক দিন আবহাওয়ার কারণে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোই সম্ভব হয় না। তারপরও লেখাপড়া ছাড়তে রাজি নয় শিশুরা।

চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আলমগীর কবির বলেন, এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে শিক্ষা দিয়ে আসা একটি বিদ্যালয়কে ১০ বছরে ছয়বার স্থান বদলাতে হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে নদীভাঙনপ্রবণ জনপদে শিক্ষা অবকাঠামো রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা কার্যকর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন পরিকল্পনা নেওয়া না হলে চকরতিনাথের মতো আরও অনেক বিদ্যালয় হয়তো মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরে নদীভাঙনের কারণে এই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে প্রায় দেড় হাজার পরিবার। চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া নতুন ভাঙনে প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ, গোয়ালঘর ও রাস্তা। অনেক পরিবার ভাঙনের আগেই নিজেদের ঘর খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে।

চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম বলেন, শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ না করতেই আমরা এই অস্থায়ী ব্যবস্থা করেছি।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, উপজেলা প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিদ্যালয়ের জন্য ২০ হাজার টাকা জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নতুন জায়গা নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থান চূড়ান্ত হলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত