জেলেদের হামলায় বিপাকে প্রশাসন
• এক সপ্তাহ আগে হিজলায় অভিযানে গিয়ে আত্মরক্ষায় কোস্ট গার্ড গুলি চালাতে বাধ্য হয়
• টেঁটা, ইটপাটকেল, আগুনের গোলা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটছে
• নিষেধাজ্ঞার পরও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ মাছ, শেল্টারে বিএনপি নেতারা

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছেন না জেলেরা। মা মাছ রক্ষায় প্রশাসনের অভিযানের শুরুতেই বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে জেলেদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। কখনো ইটপাটকেল, কখনো আগুনের গোলা নিক্ষেপ, কখনোবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে টেঁটাও। প্রকাশ্যে মাছ ধরে সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসবের নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। এতে অসহায় হয়ে পড়ছে মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও প্রশাসন। মৎস্য অধিদপ্তর বলেছে, এই অবস্থায় বরিশালের নদ-নদীতে ডিমওয়ালা মা ইলিশ রক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযানের শুরুতেই ৮ অক্টোবর থেকে হিজলার মেঘনা নদী-তীরবর্তী কয়েকটি মাছঘাটে ডাক দিয়ে মাছ বিক্রি হয়। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে হরিনাথপুর ইউনিয়নের টুমচর নদীর কিনারায় বেবাজিয়া পাড়া। এখানে রিফাত মাঝির নেতৃত্বে মাছ বিক্রি চলে। একইভাবে আবুপুর লঞ্চঘাটে বিক্রি হচ্ছে রিফাতের বাবা বিএনপি নেতা খালিদ মাঝির নেতৃত্বে। নাচকাঠী এলাকায় ইলিশ মাছ ধরা চলছে চুন্নখা ও ফরাদ বাগার নেতৃত্বে। হিজলা গৌরবদী ইউনিয়নের কাঁকুড়িয়া এলাকায় মাছ নিধন চলছে ইসমাইল শেখ, ফারুক সরকার এবং ধলু মোল্লার নেতৃত্বে। একই ইউনিয়নের অন্তর্বাম, চরকিল্লা ও জানপুর এলাকায় মাছ নিধন চলছে খোকা বেপারী ও আব্দুল কুদ্দুস লিটন দপ্তরের নেতৃত্বে। এ ছাড়া মেমানিয়া ইউনিয়নের টেকেরহাট বাজারে ইলিশের বাজার মিলছে।
জানা গেছে, শরীয়তপুরের মাছ ব্যবসায়ীরা এসে এইসব ঘাটে ডাকে মাছ বিক্রি করেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের শতকরা ১০ ভাগ দিতে হচ্ছে। একাধিক জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর নেতৃত্বে রয়েছেন হিজলা বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা। প্রতিটি মাছের ঘাট থেকে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে এই নেতাদের জন্য। তবে জেলেরা এই নেতাদের নাম বলছেন না।
যেভাবে হামলা হয়: স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা নদীতে ইলিশ মাছ রক্ষায় অভিযানে গেলেই হামলার ঘটনা ঘটছে। ইট-পাথর, বাঁশ, টেঁটার পাশাপাশি সুতা দিয়ে আগুনের গোলা তৈরি করে তা ছুড়ে মারা হয় আভিযানিক দল লক্ষ্য করে। গত শনি ও রোববার এমন ঘটনা ঘটেছে।
গত শনিবার বিকেলে মূল মেঘনা নদীতে মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের যৌথ অভিযানে ইলিশ শিকাররত ছয়টি ফিশিং বোট দেখতে পেয়ে ধাওয়া করা হয়। এ সময় নদী থেকে জাল উদ্ধারের চেষ্টা করলে ছয়টি ট্রলার নিয়ে শতাধিক জেলে একজোট হয়ে আভিযানিক দলের ওপর হামলা চালায়।
এর আগে গত শুক্রবার বিকেলে হিজলার অন্তর্বাম এলাকার মূল মেঘনা নদীতে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয় প্রশাসন ও পুলিশ, কোস্ট গার্ডের দল। ওই দিন জেলেদের ইট-পাথরের আঘাতে কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্ট গার্ড ১১ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে।
হিজলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, অভিযানের শুরু থেকেই জেলেরা আক্রমণ করে যাচ্ছেন। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁরা মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকারে যাচ্ছেন। তাঁদের ট্রলারগুলোতে অনেক জেলে থাকেন। ট্রলারের মধ্যে আগুনের গোলা বানিয়ে দূর থেকে কোস্ট গার্ড, মৎস্য অধিদপ্তরের স্পিডবোটে নিক্ষেপ করছেন। টেঁটা নিয়ে অভিযানকারীদের দিকে তাক করে থাকেন। বৃষ্টির মতো ইট-পাথর ছুড়ে মারা হচ্ছে। তিনি বলেন, জেলেদের সংখ্যার তুলনায় তাঁদের জনবল নামেমাত্র হওয়ায় অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়নের হাজিরহাট বাজার মেঘনার শাখায় ইলিশ বিক্রি চলছে দেদার। জেলেরা মাছ এনে চিকন খালের মুখে রাখেন। সেখানে শত শত মানুষ এসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ কিনে নিয়ে যায়। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সোমবার বলেন, নদীতে নামলেই মারে। আজকে হামলা হয়েছে, কালকে হামলা হয়েছে। ঠেকানো কঠিন হয়ে গেছে।
অপরদিকে বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের হবিনগর-ঝুনাহার গ্রামে নিষেধাজ্ঞা চলাকালেও ইলিশ শিকার ও প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, আড়িয়াল খাঁ ও কালাবদর নদসংলগ্ন এলাকায় জেলেরা ইলিশ শিকার করছেন।
বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জিমান বলেন, অভিযান শুরুর পর থেকে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যে হিজলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্ট গার্ডকে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করতে হয়েছে। রোববারও মেঘনা নদীতে জেলেরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন।









