Ajker Patrika

রাবির ইতিহাসে চাক সম্প্রদায়ের প্রথম নারী লাছাইনু, অর্থাভাবে অনিশ্চয়তা

দীন ইসলাম, রাবি
রাবির ইতিহাসে চাক সম্প্রদায়ের প্রথম নারী লাছাইনু, অর্থাভাবে অনিশ্চয়তা
লাছাইনু চাক। ছবি: সংগৃহীত

গহিন পাহাড় ও পাহাড়িদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে চান লাছাইনু। তাই তো দারিদ্র্য, হতাশা, বঞ্চনা—সবকিছুকে পেছনে ঠেলে দৃঢ় সংকল্প আর অদম্য চেষ্টায় তিনি ইতিহাস গড়েছেন ইতিমধ্যেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছরে চাক সম্প্রদায়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন দুর্দমনীয় লাছাইনু চাক। তিনি এ বছর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। তবে বাস্তব সত্যি ভীষণ কঠিন! দরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি দুর্ঘটনায় পা ভেঙে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় লাছাইনু লেখাপড়া ঠিকমতো চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা ভেবে উদ্বিগ্ন।

লাছাইনু চাকের বাড়ি পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির একটি প্রত্যন্ত এলাকায়। পরিবারের তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই বেড়ে ওঠা এই শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় তিনি এই সাফল্য অর্জন করেছেন।

চাক সম্প্রদায় বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, যারা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস করে। শিক্ষা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের হার খুবই কম।

লাছাইনুর পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তাঁর বাবা আলুমং চাক। কিছুদিন আগে দুর্ঘটনায় তিনি পা ভেঙে হুইলচেয়ারে চলাচল করছেন। সঞ্চয়ের সামান্য টাকায় মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তীকালে পড়ালেখা চালিয়ে নিতে পারবেন কি না, জানেন না এই বাবা।

আলুমং চাক বলেন, ‘আমার মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স পেয়েছে, সেটা শুনে শুধু আমি না পুরো গ্রামবাসী খুশি হয়েছে। তবে চান্স পাওয়ার খবর শুনে খুশি হলেও আমি অত্যন্ত কষ্টে আছি। হঠাৎ আমার পা ভেঙে গেছে। এখন আমি চিকিৎসা করব নাকি, নাকি সংসার চালাব, নাকি মেয়েকে পড়াশোনা করাব... বুঝতে পারছি না। আমার মেয়ের জন্য গ্রামবাসী বা অন্য কেউ যদি একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত, তাহলে খুব উপকার হতো। আর না হলে হয়তো ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পরও মেয়েটার পড়ার সুযোগ হবে না।’

এদিকে চাক সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম কোনো নারী শিক্ষার্থী হিসেবে রাবিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর নিজের অ্যাডমিশন যাত্রা সম্পর্কে লাছাইনু চাক বলেন, ‘আমার অ্যাডমিশন জার্নিটা আসলে অন্যদের থেকে একদম ভিন্ন ছিল। পরিবারের নানা সংকটের মধ্য দিয়েই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। আমার মা নেই। আমার বাবাই আমার সবকিছু। বাবার একান্ত ইচ্ছা আর অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আজ আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি গ্রামের একটি সাধারণ হাইস্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেছি, যেখানে শিক্ষার মান খুব বেশি ভালো ছিল না। অন্যদের মতো আমারও ইচ্ছা ছিল নামকরা স্কুল-কলেজে পড়ার। কিন্তু পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় সেই স্বপ্ন ছেড়ে দিতে হয়েছে। প্রতিদিন আমাকে বাসা থেকে হেঁটে স্কুল-কলেজে যেতে হতো। পড়াশোনার পাশাপাশি বাসার সব কাজ... রান্না থেকে শুরু করে অন্যান্য দায়িত্ব আমাকেই সামলাতে হতো। সব কাজ শেষ করে তারপর পড়াশোনা করতাম। এভাবেই কষ্টের মধ্য দিয়ে আমি আমার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন জাগে কীভাবে সে বিষয়ে লাছাইনু বলেন, ‘গ্রামের কিছু বড় ভাইদের কাছ থেকে প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ধারণা পাই। সেখান থেকেই আমার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন তৈরি হয়। তবে সব সময় একটা ভয় কাজ করত, আমি কি আদৌ পারব? কারণ, কোচিং করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের ছিল না। বাবা একাই পরিবারের সব খরচ চালাতেন, দিন-রাত পরিশ্রম করতেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাবার কাছে কোচিং বা পড়াশোনার জন্য টাকা চাওয়া আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিল। পরে “বাংলাদেশ চাক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন”-এর উদ্যোগে আমাকে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য সহায়তা করা হয়। এতে বাবা কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে সম্মতি দেন। তাদের মাধ্যমেই আমি প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাই এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে “জুম একাডেমি” নামের একটি কোচিং সেন্টার সম্পর্কেও জানতে পারি। ক্যাম্পাসে যাওয়া-আসা এবং প্রস্তুতির পুরো সময়টাতেই তাঁরা আমাকে সহায়তা করেছেন।’

প্রথমবার ভর্তিতে ব্যর্থ লাছাইনু অংশ নেন দ্বিতীয়বার। তিনি বলেন,‘দুর্ভাগ্যবশত প্রথমবার কোথাও ভর্তির সুযোগ হয়নি। পরে দ্বিতীয়বারের মতো প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। অবশেষে, আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। আজ আমার মা যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো আমার এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।’

লাছাইনু এগিয়ে যাবেন এবং তাঁর শিক্ষা, জ্ঞান, কর্ম দিয়ে আলোকিত করবেন দুর্গম পাহাড়ের অগণিত মানুষকে, বদলে দেবেন তাঁদের জীবন... এমনটিই আশা

নাইক্ষ্যংছড়ির আদিবাসীদের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত