Ajker Patrika

কম্বোডিয়ায় ‘সাইবার দাস’ হিসেবে বিক্রি, দেশে বিচারের আশায় থানার সামনে ধরনা

নুরুল আমিন হাসান, উত্তরা (ঢাকা) 
কম্বোডিয়ায় ‘সাইবার দাস’ হিসেবে বিক্রি, দেশে বিচারের আশায় থানার সামনে ধরনা
ভাটারা থানার সামনে ভুক্তভোগী তিন তরুণ। ছবি: আজকের পত্রিকা

উচ্চ বেতনের চাকরির রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে চার যুবককে কম্বোডিয়ায় পাচার করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল চীনাদের পরিচালিত একটি ‘সাইবার স্ক্যাম’ সেন্টারে। সেখানে দিনের পর দিন ইলেকট্রিক শক আর অমানুষিক নির্যাতন সয়ে, কয়েক দফায় মুক্তিপণ দিয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে দেশে ফিরেছেন তাঁরা।

কিন্তু দেশের মাটিতে ফিরেও শেষ হয়নি তাঁদের লড়াই। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ভাটারা থানার দোরগোড়ায় ১৭ দিন ধরে ঘুরছেন এই নিঃস্ব যুবকেরা। এমনকি মামলার দাবিতে তিন দিন ধরে থানার সামনেই অনাহারে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তাঁরা।

​ভুক্তভোগী তরুণদের অভিযোগ, ৯ এপ্রিল মামলার আবেদন দিলেও পুলিশ গড়িমসি করছিল। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার থেকে আজ শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চার ভুক্তভোগী থানার সামনে অবস্থান নেন। এর মধ্যে জাহিদ শেখ নামের একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। অন্যরা ‘মামলা না হওয়া পর্যন্ত’ বাড়ি না ফেরার পণ করেছেন।

প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী তরুণেরা হলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার বড়নূরপুর গ্রামের আমির মিয়ার ছেলে মো. আলামিন ও তাঁর ভাগনে মো. জাহিদ শেখ এবং বগুড়ার শাজাহানপুরের বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন ও মো. মাহিদুল।

ভুক্তভোগী সানোয়ার হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা ৯ এপ্রিল আমাদের বিদেশে পাচার করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে থানায় অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত মামলা নেয়নি পুলিশ।’

সানোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘মামলা করার জন্য আমরা চার ভুক্তভোগী তিন দিন ধরে খাওয়াদাওয়া, ঘুম বাদ দিয়ে থানার সামনে পড়ে আছি।’

​যেভাবে চলত সাইবার দাসত্ব

ভুক্তভোগী মো. আলামিন জানান, ওয়ার্ক পারমিট ভিসার কথা বলে তাঁদের পাঠানো হয়েছিল ট্যুরিস্ট ভিসায়। কম্বোডিয়া বিমানবন্দরে নামার পরই গোলাম মোস্তফা মুকুল ও আরিফ শেখ নামের দুই পাচারকারী তাঁদের ডলার কেড়ে নেয়। তিন দিন পর তাদের ১ হাজার ৫০০ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় চীনাদের একটি স্ক্যাম সেন্টারে।

​আলামিন বলেন, ‘চীনারা আমাকে একটি মেয়ের নামে ভুয়া আইডি খুলে দিয়েছিল। আমার কাজ ছিল আমেরিকার বিত্তশালীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া। এই কাজে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হতো নির্যাতন। ইলেকট্রিক শক দিয়ে অচেতন করা হতো, প্লাস দিয়ে নখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা চলত।’

​মুক্তির জন্য দফায় দফায় মুক্তিপণ

জানা গেছে, পরিবারের পাঠানো টাকায় চীনাদের কাছ থেকে মুক্তি পেলেও আবারও বাংলাদেশি পাচারকারী মুকুলের খপ্পরে পড়েন তাঁরা। সেখানে একটি ঘরে ১৫ দিন আটকে রেখে আবারও জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। শেষ পর্যন্ত ধারদেনা করে বিমানের টিকিট কেটে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তাঁরা দেশে ফেরেন।

ভুক্তভোগী তরুণদের দাবি, ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁরা রাজধানীর ভাটারার বাঁশতলা এলাকার ‘এম আর ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রনি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাসুদ রানা রনি একেকজনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নেন। এ ছাড়া পুরোনো পল্টনের রিক্রুটিং এজেন্সি ‘মেসার্স বাংলাদেশ’ থেকে ভুয়া ডিমান্ড লেটার তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁদের অভিযোগ।

​পুলিশের বক্তব্য

মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগটি পাওয়ার পর আমরা তদন্ত করেছি এবং পাচারের সত্যতা পাওয়া গেছে। আজ মামলাটি নথিভুক্ত করা হবে। পরবর্তী কার্যক্রম সিআইডি পরিচালনা করবে।’

​ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তা মো. আল আমিন নয়ন বলেন, ‘ঘটনাটি শুধু চারজনের ব্যক্তিগত লড়াই নয়; এটি আমাদের বিচারব্যবস্থার এক কঠিন চিত্র। পাচারের শিকার মানুষ যখন বিচারের জন্য থানার সামনে না খেয়ে পড়ে থাকে, তখন বুঝতে হবে পাচারকারীরা কতটা প্রভাবশালী।’

​সর্বশেষ আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা থানার সামনে মামলার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন। তাঁরা জানিয়েছেন, মূল হোতাদের গ্রেপ্তার না দেখা পর্যন্ত তাঁদের এই লড়াই থামবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঢাবি ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার, শিক্ষক ও বন্ধু পুলিশ হেফাজতে

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনার আড়ালে ঢাকাকে কী বার্তা দিল দিল্লি

হোয়াইট হাউসের ডিনারে হামলা: মেধাবী প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক অ্যালেন কেন অস্ত্র তুলে নিলেন

গুরুকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস, শিষ্য রকি প্রকাশ্যে খুন: বগুড়ায় সন্ত্রাসী চক্রের দ্বন্দ্ব ভয়ংকর

ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে গুলি: আটক যুবক সম্পর্কে যা জানা গেল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত