Ajker Patrika

ফুলবাড়ী-সান্তাহার রেলপথের ৭৭ কিলোমিটার ঝুঁকিতে, ধীরগতিতে চলছে ট্রেন

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি 
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ১৭: ০৩
ফুলবাড়ী-সান্তাহার রেলপথের ৭৭ কিলোমিটার ঝুঁকিতে, ধীরগতিতে চলছে ট্রেন
পশ্চিমাঞ্চল রেললাইনের দিনাজপুরের ফুলবাড়ী অংশ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ছবি: সংগৃহীত

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে বগুড়ার সান্তাহার পোতা রেলগেট পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চল রেলপথের প্রায় ৭৭ কিলোমিটারজুড়ে শত শত কংক্রিট স্লিপার ভেঙে গেছে। অনেক স্থানে রেললাইন আটকে রাখার প্যান্ড্রল ক্লিপও নেই। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে আন্তনগর, মেইল ও মালবাহী ট্রেন। দুর্ঘটনা এড়াতে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ঘণ্টায় মাত্র ১০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রেলপথের বিভিন্ন স্থানে স্লিপার ভাঙা, রেললাইনের জোড়া নড়বড়ে হয়ে যাওয়া এবং পাথর সরে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

রেল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, জয়পুরহাট, পাঁচবিবি, বাগজানা, আক্কেলপুর, তিলকপুর ও জামালগঞ্জের বিভিন্ন অংশে শত শত কংক্রিট স্লিপার ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক স্থানে স্লিপার ভেঙে রড বেরিয়ে এসেছে এবং প্যান্ড্রল ক্লিপ খুলে গেছে। ফলে ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইন চাপের কারণে ওঠানামা করে, যা নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

ফুলবাড়ী রেলস্টেশন দিয়ে প্রতিদিন আপ ও ডাউন মিলিয়ে ২৪টি আন্তনগর, মেইল ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। স্টেশনটি থেকে মাসে প্রায় ৪৫ লাখ এবং বছরে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় সমাজকর্মী সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল, সাবেক পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আলী মিরু ও আব্দুল মোতালিব পাপ্পু বলেন, রেললাইনের বিভিন্ন অংশে স্লিপার ভেঙে গেছে, অনেক জায়গায় প্যান্ড্রল ক্লিপ নেই। ট্রেন চলাচলের সময় লাইন দেবে যায়। দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো সংস্কার না করলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

তাঁরা জানান, চলতি বছরের ২৩ মার্চ ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলপথের ৩৫২/৫ ও ৩৫২/৬ কিলোমিটারের মাঝামাঝি স্থানে একটি কংক্রিট স্লিপার ভেঙে যায়। বিষয়টি দেখে কৃষক এনামুল হক কলার মোচার লাল অংশ নেড়ে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী আন্তনগর পঞ্চগড় এক্সপ্রেস থামিয়ে দেন। তার তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তায় সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। পরে রেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে পুরস্কৃত করে।

এর আগে গত ১৮ মার্চ আদমদীঘির বাগবাড়ী এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেসের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ওই দুর্ঘটনায় দুই শতাধিক যাত্রী আহত হয়। এর পর থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মোবারকপুর এলাকার বাসিন্দা হামিদুল হক, আশিকুর রহমান ও আব্দুল হাই বলেন, মোবারকপুর রেলগেটসংলগ্ন অংশে অধিকাংশ কংক্রিট স্লিপার ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও রড বেরিয়ে এসেছে এবং প্যান্ড্রল ক্লিপ খুলে গেছে। ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইন স্পষ্টভাবে কেঁপে ওঠে।

রেল বিভাগের ওয়েম্যান ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কী-ম্যান মাহাবুবুল আলম বলেন, ছোটখাটো ত্রুটি মেরামত করা হলেও বড় ধরনের সমস্যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। ভাঙা স্লিপারের বিষয়টিও জানানো হয়েছে।

রেল বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ফুলবাড়ী থেকে সান্তাহার পর্যন্ত ৭৭ কিলোমিটার রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের অর্ধেকেরও বেশি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। উপসহকারী প্রকৌশলীর পদ খালি রয়েছে। ১০টি কী-ম্যান পদের সবগুলোই শূন্য। এ ছাড়া ট্রলিম্যান, নিরাপত্তাকর্মী, বেলোম্যান ও হ্যামারম্যানেরও একাধিক পদ খালি থাকায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে।

ফুলবাড়ী রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার আনন্দ চক্রবর্তী বলেন, স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন ২৪টি ট্রেন চলাচল করে। ৩৬৫/৪ থেকে ৩৬৫/৫ কিলোমিটার অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গত ২৫ এপ্রিল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ওই অংশে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দেয়। এরপর থেকে নির্দেশনা অনুযায়ী ট্রেন চলাচল করছে।

পার্বতীপুরের উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) শেখ আল আমিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কংক্রিট স্লিপার পরিবর্তনের কাজ চলছে। তবে জনবল সংকটের কারণে কাজের গতি ধীর। ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ হলে দ্রুত সংস্কার সম্ভব হতো।

পাকশী রেলওয়ে বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) ভবেশ চন্দ্র রাজবংশী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। স্থায়ী সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে তিনটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কাজ শুরু হলে রেলপথের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত