Ajker Patrika

ইসলামের সঙ্গে ফকির লালনের কোনো বিরোধ নেই: ফরহাদ মজহার

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
ইসলামের সঙ্গে ফকির লালনের কোনো বিরোধ নেই: ফরহাদ মজহার
ছেঁউড়িয়ায় লালন একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে ফরহাদ মজহার। ছবি: আজকের পত্রিকা

কবি, চিন্তক ও গবেষক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ইসলামের সঙ্গে ফকির লালন শাহের কোনো বিরোধ নেই। লালন ইসলাম সংস্কারের জন্য আসেননি, আবার শরিয়ত-মারফত নিয়েও কোনো তর্ক তোলেননি। তিনি তাঁর নিজস্ব একটি পথের কথা বলেছেন, যাকে ‘নদীয়ার ভাবের ভুবন’ বলা যায়। এটা দর্শনচর্চা, ভাবচর্চা ও রসচর্চার অংশ।

আজ রোববার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন একাডেমির মিলনায়তনে ‘ফকির লালন শাহ বাংলার ভাব ও ভাষার ঐশ্বর্য’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান বক্তার বক্তব্যে ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ প্রতিপাদ্যে জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমি যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আমাদের এখানে চারজন এমপির মধ্যে তিনজনই জামায়াতের। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তাদের মধ্যে বড় বড় নেতা যারা, এখন নেই। তারা যদি জীবিত থাকতেন, তারা ভিন্নভাবে ফকির লালনকে নিতেন। তারা অনেক বিচক্ষণ ছিলেন। তারা বুঝতেন যে, ইসলামের সঙ্গে ফকির লালনের কোনো বিরোধ নেই।’

তিনি বলেন, ‘এই ভাবচর্চা, রসচর্চার আগে ছিল তন্ত্র। তন্ত্র থেকে রস, রস থেকে ভাব—এই তিনটি স্তর বাংলায় ভাবের মূল। এটা অসাধারণ একটা কাজ। আমরা যারা কিছুসংখ্যক মানুষ তাঁদের কাছ থেকে অল্প কথা শুনেছি, অল্প কিছু শিক্ষা পেয়েছি, তাঁদের কথা বলি। আপনারা রাগ করেন। কিন্তু আপনারা যদি আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে অন্তত না শোনেন, তাহলে আমরা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ি। তখন আমরা কেউ এই মাজারকে রক্ষা করতে পারব না।’

লালনের গান প্রসঙ্গে মজহার বলেন, ‘ফকির লালন শাহ তাঁর ভাব ও ভাষার মাধ্যমে বাংলা, আরবি ও ফারসি ভাষার যে ব্যবহার দেখিয়েছেন, তা সাহিত্যের দিক থেকে দেখলেও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যারা ধর্মপ্রাণ ভাই-বোন আছি, তারা অনেক সময় আপত্তি করি। যেমন—“পারে কে যাবি লোকের নৌকাতে আয়”—এই গানের মধ্যে তারা একবারও খেয়াল করেন না, গানের শুরুতেই লেখা আছে রূপকাষ্ঠের নৌকা। তিনি রূপক অর্থে বুঝিয়েছেন।’

ফরহাদ মজহার আরও বলেন, ‘ভাবগত তর্ক আমাদের মধ্যে আছে, ফকিরদের মধ্যে আছে, সমাজের মধ্যেও আছে। থাকুক, অসুবিধা কী? কিন্তু আমরা যেন কারও অনুভূতিতে আঘাত না করি। যাতে এই সাঁইজির ধাম ও ফকির লালন নিজেই বিপদের মধ্যে না পড়েন। আমি সেই বিপদের সম্ভাব্য বিভিন্ন দিক ইতিমধ্যে দেখতে পেয়েছি।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উপসচিব) মো. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে ফকির লালন শাহের জীবন, কর্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন, ফোকলোর বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী, আলোকচিত্রী ও সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তাসলিমা আখতার, জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান ও কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলামসহ অনেকে।

আলোচকেরা বলেন, ফকির লালন শাহ কেবল বাউল সম্রাট নন, তিনি বাংলার ভাব ও ভাষার ঐশ্বর্যের অন্যতম প্রধান রূপকার। তাঁর গান ও দর্শনে মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানুষের মুক্তির কথা উঠে এসেছে। লালনের সহজ ভাষা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সেমিনারে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, লালন একাডেমির সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিক ও লালন অনুরাগীরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত