Ajker Patrika

প্রথমবারের মতো দণ্ডিত খান পরিবারের সদস্য

আনোয়ার সাদাৎ ইমরান, টাঙ্গাইল 
প্রথমবারের মতো দণ্ডিত খান পরিবারের সদস্য
রফিকুল ইসলাম ওরফে ফারুক ও সানিয়াত খান (বাপ্পা)

টাঙ্গাইলের রাজনীতিতে চার দশক ধরে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচিত খান পরিবারের এক সদস্যের প্রথমবারের মতো সাজা হয়েছে। একটি হত্যা মামলায় গতকাল সোমবার পরিবারটির ছোট ছেলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সানিয়াত খানকে (বাপ্পা) মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

চাঁদাবাজি, হত্যা, সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে পরিবারটির সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মামলা হলেও এত দিন কারও সাজা হয়নি।

বাপ্পা টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আতাউর রহমান খানের ছেলে। এ ছাড়া একই আসনের সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান (রানা) বাপ্পার বড় ভাই।

আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল সদরের দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম ওরফে ফারুককে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার মামলায় আসামি বাপ্পা। গতকাল টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ফয়সাল আল মামুন এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত বাপ্পাসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড দেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে চারজনকে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি হলেন টাঙ্গাইল শহরের কাগমারা এলাকার মো. আজাদ ও শ্রীফলিআটা গ্রামের মো. শাজাহান মিয়া। ফাঁসির আসামিদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বাপ্পাসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সবাই পলাতক।

দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি বরাবরই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান খান। অপর অংশের নেতৃত্ব দিতেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। ১৯৯০ সালে কাদের সিদ্দিকী ভারত থেকে দেশে ফেরার পর খান ও সিদ্দিকী পরিবারের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। চাচা শামসুর রহমান খানের পক্ষে তাঁর ভাতিজা আমিনুর রহমান খান (বাপ্পি), আমানুর রহমান খান (রানা) ও সহিদুর রহমান খান (মুক্তি) একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন। তাঁরা শহরের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ সময় তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়। এ জন্য তাঁদের কারাগারেও যেতে হয়েছে বহুবার।

২০০৩ সালের নভেম্বরে সন্ত্রাসী হামলায় আমিনুর রহমান খান (বাপ্পি) নিহত হন। তিনি নিহত হওয়ার পর তাঁদের অপর দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান (কাকন) ও সানিয়াত খান (বাপ্পা) এসে ভাইদের সঙ্গে যুক্ত হন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খান পরিবারের সন্তানদের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। ২০১২ সালে খান পরিবারের ছেলে আমানুর রহমান খান টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১১ সালে তাঁর ভাই সহিদুর রহমান খান টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। অপর ভাই জাহিদুর রহমান খান বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব নেন। ছোট ভাই সানিয়াত খান কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি হন। পুরো জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, ঠিকাদারি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

থানা-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হত্যা, চাঁদাবাজি-দখল, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। আমানুর রহমানের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি হত্যা মামলাসহ অর্ধশতাধিক মামলা হয়। সহিদুর রহমানের বিরুদ্ধেও পাঁচটি হত্যা মামলাসহ প্রায় ৪০টি মামলা হয়েছে। জাহিদুরের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা, সানিয়াতের বিরুদ্ধে চারটি হত্যাসহ ডজন খানেক মামলা হয়েছে। গত বছর আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায়ও চার ভাই বেকসুর খালাস পান।

ফারুক হত্যা মামলার বাদী ছোট ভাই লাভলু মিয়া গতকাল বলেন, ‘আমরা এই রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।’

আসামিপক্ষের একাংশের আইনজীবী একেএম শামীমুল আক্তার বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আদেশ দিয়েছেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত