Ajker Patrika

জনস্বাস্থ্য সেবা: ২১২ নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনিশ্চয়তার ছায়া

  • মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের কারণে জটিলতা
  • ২১২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদনের কার্যক্রমে সমস্যা
  • স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন বন্ধ দুই-তিন মাস ধরে
সাইফুল মাসুম ও মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
জনস্বাস্থ্য সেবা: ২১২ নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনিশ্চয়তার ছায়া
ফাইল ছবি

দুই মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানিতে অনিশ্চয়তায় ভুগছে ২০০-এর বেশি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের ৬৭টিসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ২১২টি প্রতিষ্ঠান এ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। দাপ্তরিকভাবে মন্ত্রণালয় পরিবর্তনজনিত কারণে এক মাসের বেশি সময় ধরে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রশাসনিক ও সেবা কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের সমস্যার পাশাপাশি চাকরির অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেক কর্মী।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন (এলজিআরডি) ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদনের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাজ চালিয়ে আসছিল। তবে চলতি অর্থবছর থেকে সরকার এসব কেন্দ্রের দায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে। ২২ এপ্রিল এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও জেলার সিভিল সার্জনদের কাছে পাঠানো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, নগরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন ও ২১টি পৌরসভায় ৪৫টি নগর মাতৃসদন এবং ১৬৭টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ১৫টি অংশীদার এনজিওর মাধ্যমে ৩ হাজার ৪৭২ জন কর্মী কাজ করছেন। প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ (জনসংখ্যার কমবেশি ১০ শতাংশের মতো) এসব কেন্দ্র থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন।

গত সপ্তাহে রাজধানীর কয়েকটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন ঘুরে সেখানে আগের মতোই রোগীদের ভিড় দেখা যায়। তবে অনেক সেবাগ্রহীতা অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ করেন। মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী নগর মাতৃসদনে চিকিৎসা নিতে আসা রায়েরবাজার এলাকার এক প্রসূতি আসমানী বেগম (ছদ্মনাম) বলেন, আগে যে খরচে চিকিৎসা পাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে। দরিদ্র রোগীদের জন্য এটা খুব কষ্টকর। পাশাপাশি আগের মতো সহজে সেবাও পাওয়া যাচ্ছে না।

মিরপুর মাজার রোডের নগর মাতৃসদনে আসা এক প্রসূতির স্বামী রফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বলেন, কম খরচের আশায় এখানে এসেছিলেন। কিন্তু ওষুধের বেশির ভাগই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে, ফলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

দুই-তিন মাস ধরে বেতন বন্ধ

এদিকে অনেক কেন্দ্রের কর্মীদের বেতন দুই থেকে তিন মাস ধরে বেতন বন্ধ রয়েছে। মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী নগর মাতৃসদন পরিচালনা করে বেসরকারি সংস্থা নারী মৈত্রী। সংস্থাটির কর্মকর্তা আসাদুল ইসলাম মামুন বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি করপোরেশন থেকে অর্থ না পাওয়ায় তিন মাস ধরে বেতন বকেয়া রয়েছে। তবে এতে চিকিৎসাসেবায় প্রভাব পড়েনি।

নগর স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালনা ব্যয়ের ৫০ শতাংশ এসেছে সেবাগ্রহীতাদের ফি থেকে। ২৫ শতাংশ দেওয়ার কথা সিটি করপোরেশনের এবং বাকি ২৫ শতাংশ স্থানীয় সরকার বিভাগের। কিন্তু দুই উৎস থেকেই অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জুনের মধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর স্থাপনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে জনবল ও সেবা পরিচালনা নিয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়েও আমরা কাজ করছি।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, ‘আমাদের অংশের বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অংশের ২৫ শতাংশ অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া চলছে।’

এদিকে কেন্দ্রগুলোর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে পরিচালনা নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। মিরপুর মাজার রোডের নগর মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের নগর স্বাস্থ্য প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ডা. নাঈলা পারভীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে মৌখিক আশ্বাস পেয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো লিখিত নির্দেশনা পাইনি।’

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছ থেকে তারা ১৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্থাপনা বুঝে নিলেও এর মধ্যে দুটি তথ্যের পুনরাবৃত্তি (ডুপ্লিকেশন) রয়েছে। ফলে কার্যত ১৯০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় এসেছে। বেতন-ভাতা, পরিচালন ব্যয়, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ অন্যান্য খরচ নির্বাহের জন্য প্রাথমিকভাবে তিন মাসের অর্থ বরাদ্দ চেয়ে অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, আপাতত তিন মাসের পরিচালন ব্যয়ের জন্য অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রগুলো চালু করা গেলে নগরবাসী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক পাবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত