Ajker Patrika

শশী থারুরের নিবন্ধ /পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—নতুন বছরে চতুর্মুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ভারত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ২৩
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

ভারত এক অস্থির আঞ্চলিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সদ্য গত বছরটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আর বাংলাদেশের নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য, যার গভীর প্রভাব রয়েছে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারণী মহলের আঙিনায়—ভারতের নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক প্রসারের ওপর।

ভারতের ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। দীর্ঘকাল ধরে নয়াদিল্লির আঞ্চলিক কৌশল দাঁড়িয়েছিল ‘স্থিতিশীল বন্ধু’ এবং ‘নিয়ন্ত্রিত শত্রু’—এই দুই মেরুর ওপর ভিত্তি করে। আজ সেই সমীকরণ ভেঙে এক জটিল ও অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা থেকে ভারতপন্থী শাসনের বিদায় থেকে শুরু করে ইসলামাবাদের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধের কাছাকাছি পর্যায়ের সংঘাত—সব মিলিয়ে ভারতের নিকট প্রতিবেশী অঞ্চলকে ঘিরে বছরের শেষ রিপোর্ট কার্ড এক ভূ-রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।

২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো বাংলাদেশের কাঠামোগত রূপান্তর। শেখ হাসিনার অধীনে ভারতের জন্য যে ১৫ বছরের ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল, তার বদলে ভারত এখন এমন এক ঢাকার মুখোমুখি, যা আদর্শিকভাবে অস্থির এবং কৌশলগতভাবে বেশ দূরে।

নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রনেতাদের বিপ্লবী উদ্দীপনা এবং আওয়ামী লীগের পতনের ফলে সৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে বছরটি পার করেছে। ভারতের জন্য এর প্রভাব বেশ তীব্র। ভারতের জন্য ‘সবার আগে নিরাপত্তা’ স্তম্ভটি—যেখানে ঢাকা সক্রিয়ভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সেভেন সিস্টার্সের বিদ্রোহীদের দমন করত, তা এখন আর নিশ্চিত নয়; বরং উল্টো বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি ভারতের এই ‘নাজুক অবস্থানে’ পাকিস্তানের (গোয়েন্দা সংস্থা) আইএসআই-এর পানি ঘোলা করার প্রবল সম্ভাবনাও রয়ে গেছে। এক ছাত্রনেতা হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের ছাত্রনেতারা ক্রমশ উসকানিমূলক কথাবার্তা বলছেন। কেউ কেউ ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, এমনকি এক নেতা দাবি করেছেন, তাঁর দেশ জানে কীভাবে ভারতকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয়।

জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থী শক্তির পুনরুত্থান সাম্প্রদায়িক উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড এবং ঢাকার পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে, যা নয়াদিল্লির জন্য অস্বস্তিকর। ২০২৫ সাল জুড়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ ধ্বংসের খবর ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের’ সেই নিবিড় সম্পর্ককে তিক্ত করে তুলেছে।

সম্প্রতি হিন্দু শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় উভয় দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যা গড়িয়েছে কূটনৈতিক মিশনগুলোর সামনে বিক্ষোভ পর্যন্ত। এদিকে বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবে ধুঁকছে। বন্দর, রেল এবং এনার্জি গ্রিডের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ভারতের ছিল, তা এখন পুরোপুরি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করছে।

২০২৬ সালে প্রবেশের মুখে ভারতকে এখন ‘ঐতিহ্যনির্ভর’ কূটনীতি থেকে বেরিয়ে ‘লেনদেনকেন্দ্রিক’ বা বাস্তববাদী সম্পর্কের দিকে ঝুঁকতে হবে। ১৯৭১ সালের আবেগের বন্ধন ঢাকার বর্তমান ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি-এর কাছে আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ভিত্তি হিসেবে যথেষ্ট নয়, কারণ তারা সেই মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, নয়াদিল্লি এখন এক অপ্রত্যাশিত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে ভারতের প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে এমন এক নতুন জাতীয়তাবাদী প্রজন্মের কাছে, যারা গত সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থনকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখে। বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আগামী নির্বাচন কি আদৌ অবাধ ও সুষ্ঠু হবে, নির্ধারিত সময়ে আদৌ ভোট হবে কিনা—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশীর দিকে যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধাঁধা, পশ্চিমে তখন হার্ডকোর সামরিক অবস্থান। ২০২৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ২০১৯ সালের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাত দেখা গেছে। মে মাসে পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার জবাবে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে, মোদি সরকারের ‘কৌশলগত ধৈর্যের’ সীমা আরও কমেছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্নধর্মী। তারা ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করেছে এবং এ ক্ষেত্রে চীনের স্যাটেলাইট থেকে রিয়েল টাইম গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইসলামাবাদের নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড গঠন এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তির দিকে তাদের ঝুঁকে পড়া এক ‘অপ্রতিসম প্রতিরোধ’ কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।

একই সময়ে পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছর শেষে ২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যার পেছনে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতের কিছুটা উন্নতি। সরকার কৃষিপণ্য, খনিজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বড় বড় বুলি আওড়ালেও বিদেশি বিনিয়োগ ২৫ শতাংশের মতো কমে গেছে। আইএমএফ-এর সাহায্যের ওপর নির্ভরতা তাদের অর্থনীতির ভঙ্গুরতাই তুলে ধরে, কিন্তু মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ছাড়াও চীন ও সৌদি আরবের মতো বিদেশি পৃষ্ঠপোষকেরা ঋণ এবং গ্যারান্টি দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

এটা ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয়, কারণ পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা অনেক সময় সীমান্তে হঠকারিতার রূপ নেয়। যদি অর্থনীতি ব্যর্থ হয় এবং সর্বশক্তিমান সামরিক বাহিনী আবারও জনরোষের মুখে পড়ে, তবে নজর ঘোরানোর জন্য তারা ভারতের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুরবস্থা সত্ত্বেও পাকিস্তান ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতিতে পারদর্শিতা দেখিয়েছে। তারা সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরল খনিজ সম্পদের মতো ‘অপ্রথাগত’ নিরাপত্তা বিষয়ে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন করেছে। ভারতের জন্য এখন ‘টু-ফ্রন্ট চ্যালেঞ্জ’ বা দুই ফ্রন্টে সংঘাতের আশঙ্কা আর নিছক তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি বাস্তব। পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোয় ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিকীকরণ এবং চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সফল সম্পর্ক ভারতের জন্য ইসলামাবাদকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করা কঠিন করে তুলেছে।

ঢাকা এবং ইসলামাবাদ—উভয়ের আলাদা পরিস্থিতির সাধারণ যোগসূত্র হলো বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ‘বিকল্প অংশীদার’ খুঁজতে গিয়ে অবকাঠামো ও বন্দর খাতে চীনা বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে পাকিস্তানে সিপিইসি হলো তাদের মৃতপ্রায় অর্থনীতির লাইফলাইন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রাধান্য ক্ষুণ্ন করতে চীন যে সুযোগসন্ধানী কূটনীতি চালাচ্ছে, তা মোকাবিলা করতে ভারতকে দ্রুত কানেকটিভিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জন সম্পর্ক বাড়াতে হবে, যদিও বর্তমান পরিস্থিতি তার প্রতিকূলে। প্রতিবেশীদের অস্থিতিশীলতা-অনুপ্রবেশ, জঙ্গিবাদ এবং শরণার্থী সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যে সুবিধা ছিল, তাকে টক্কর দিচ্ছে চীনের ‘বিনিয়োগ-নির্ভর কূটনীতি’। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার দাবি করলেও চীনের সঙ্গে লড়াইয়ে তাকে দিল্লির ভরসা করার মতো নিশ্চয়তা নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের প্রতি কিছুটা নমনীয় এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে তাঁর সখ্য (২০২৫ সালে তিনবার দেখা করেছেন), ভারতের জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তান কি গাজায় শান্তি বজায় রাখতে সৈন্য দেবে, নাকি আফগান সীমান্ত সামলাবে—তা নিয়ে ট্রাম্পের যে আগ্রহই থাকুক না কেন, ভারতের জন্য এর ফল ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এই অবস্থায় ২০২৫ শেষ হয়ে ২০২৬ শুরু হওয়ার এই সন্ধিক্ষণে ভারতের প্রতিবেশী পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংস্কার রাজনৈতিক অস্থিরতার কাছে জিম্মি, আর ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এমন এক পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে সামলানো, যারা দেউলিয়া হওয়ার কিনারে থেকেও আক্রমণাত্মক শক্তি আধুনিকায়ন করতে শিখে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এক অনিশ্চিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু সংকট মোকাবিলা করা নয়, বরং কূটনীতি ও কৌশলগত দূরদর্শিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক শৃঙ্খলা পরিকল্পনা নতুন করে সাজানো।

২০২৬ সালে প্রবেশকালে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের আচরণই হবে তার আঞ্চলিক নেতৃত্বের লিটমাস টেস্ট। নিজের উঠানে আগুন জ্বললে ‘গ্লোবাল সাউথের’ নেতা হওয়ার তকমা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘে তার ভোটের মাধ্যমে নয়, বরং তার সীমান্তের চারপাশের রাষ্ট্রগুলোকে কতটা স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে তার ভিত্তিতে বিচার করা হবে। বছরের শেষে তাই কোনো সমাধান নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা রয়ে গেল—বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় নৈকট্য আর কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি একটি দুর্বলতা যা কঠোর ও নির্মোহ ব্যবস্থাপনার দাবি রাখে। তবে ভারত যদি চায়, তবে ভারতই এটি করতে পারে।

এনডিটিভি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকা সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত