Ajker Patrika

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের নিবন্ধ /মার্কিন নেতৃত্বে ‘সম্পদ সাম্রাজ্যবাদের’ নতুন যুগের যাত্রা কি শুরু হলো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৫৩
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পদ সাম্রাজ্যবাদ অভিমুখী যাত্রা শুরু হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পদ সাম্রাজ্যবাদ অভিমুখী যাত্রা শুরু হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলা ‘চালানো’ এবং দেশটির লাখ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রির অর্থ ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়ন্ত্রণে’ রাখা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে দম্ভোক্তি, তা বিশ্বরাজনীতিকে নতুন এক যুগে ঠেলে দিয়েছে। তবে ভেনেজুয়েলার তেল দখলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রয়োগ নতুন ভবিষ্যতে ঝাঁপ দেওয়ার চেয়ে বরং অতীতের এক অস্বস্তিকর প্রত্যাবর্তনেরই ইঙ্গিত।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্পদের দখলকে কেন্দ্র করে, মসলা থেকে সোনা, রাবার থেকে তেল, বিশ্ব বিভক্ত ছিল বিভিন্ন প্রভাববলয়ে। সেই প্রতিযোগিতাই জন্ম দিয়েছিল উপনিবেশবাদ এবং অনেক দেশের সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল তখনই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে কেবল আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কোনোভাবে টিকে ছিল। এখন সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে এবং বিশ্ব আবার ফিরে যাচ্ছে ‘সম্পদ সাম্রাজ্যবাদের’ যুগে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্বালানি ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল ইয়েরগিন বলেন, ‘হঠাৎ করে উনিশ শতক এবং দুই বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়টা আরও জোরে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে। বিশ্ব এখন বিশ্বায়ন, উন্মুক্ত সীমান্ত ও তুলনামূলক মুক্তবাণিজ্যের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সেই যুগ পেরিয়ে এসেছি, যখন বিশ্বাস করা হতো যে বাজার নিজেই ভালোভাবে কাজ করবে। এখন এমন এক সময়ে ঢুকছি, যখন সরকারের দৃশ্যমান হাত আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান।’

ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোর অপহরণের মতো নজিরবিহীন ঘটনাসহ যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম পদক্ষেপের সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কম উদাহরণ রয়েছে। তবে এই ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দুটি ভিন্ন কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত পরিবর্তনের দিকে বিশ্ববাসীর নজর টেনেছে।

প্রথম পরিবর্তনটি এসেছে মূলত চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের সাফল্যের প্রতিক্রিয়ায়। আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত বিরল খনিজের ওপর চীনের প্রায় একচেটিয়া দখল। পাশাপাশি কোবাল্ট ও নিকেলের মতো জ্বালানি রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ খনিজে তাদের আধিপত্য ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর জবাবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও খনিজ নিশ্চিত করতে বিদেশে মার্কিন শিল্পনীতির বিস্তার ঘটাতে চাইছেন।

ইয়েরগিনের ভাষায়, গত এপ্রিল মাসে বেইজিং যখন ট্রাম্পের তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের জবাবে বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে, তখন ওয়াশিংটনের ভেতরে বিষয়টি একধরনের ‘বৈদ্যুতিক ধাক্কা’ দেয়। ইয়েরগিন বলেন, ‘সহজ বিশ্বায়নের পুরোনো ধারণা এখন প্রায় বাতিল হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে স্থিতিস্থাপকতা, ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রণের দিকে।’

পররাষ্ট্রনীতির দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন হলো ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিনের পুনরুজ্জীবন, যাকে ব্যঙ্গ করে এখন ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলা হচ্ছে। একসময় এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপকে লাতিন আমেরিকা থেকে দূরে রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এই নীতির উল্লেখ রয়েছে এবং সেখানে যোগ করা হয়েছে তথাকথিত ‘ট্রাম্প করোলারি’, যা পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রভাবকে প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলকে ‘বিদেশি শত্রুর হস্তক্ষেপ বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিকানা থেকে মুক্ত’ রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অর্থমন্ত্রী আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের সুরে সেখানে আরও বলা হয়, প্রতিরক্ষা বা অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রস্তুত পণ্য পর্যন্ত কোনো ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র যেন বাইরের কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়।

ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে, পশ্চিম গোলার্ধের সংজ্ঞাও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। ডেনমার্ক-নিয়ন্ত্রিত বিশাল আর্কটিক অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের কথাও বলেছেন। কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের সম্ভাবনাও রয়েছে।

টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুলের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক ড্যানিয়েল ড্রেজনার বলেন, ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রীতি ছিল—‘শক্তি প্রয়োগ করে সীমান্ত পরিবর্তন করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল, যেমন ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন যে ব্যতিক্রমই নিয়মকে গ্রাস করছে।’

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পদ দখলের বিষয়টি যুক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের নিয়ন্ত্রণে যেতে আমরা দেব না। চীনের তেল কেন দরকার? রাশিয়ার কেন দরকার? ইরানের কেন দরকার?...এটি পশ্চিম গোলার্ধ। এখানেই আমরা বাস করি।’

উনিশ শতকের প্রসঙ্গ থাকলেও ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপের সবচেয়ে কাছের উদাহরণ হতে পারে—ইরান (১৯৫৩) ও গুয়াতেমালা (১৯৫৪)। ইরানে ব্রিটিশ তেল স্বার্থ জাতীয়করণের অপরাধে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাতে সিআইএ ও ব্রিটিশ এমআই-৬ যৌথভাবে অভ্যুত্থান ঘটায়। গুয়াতেমালায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির জমি জাতীয়করণের পর প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেঞ্জকে হটাতেও সিআইএ সমর্থন দেয়।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি সেই ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি। যদিও মোসাদ্দেক ও আরবেঞ্জের মতো মাদুরো বৈধভাবে নির্বাচিত ছিলেন না। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, হুগো শ্যাভেজের আমলে মার্কিন তেল স্বার্থ জাতীয়করণের ‘প্রতিশোধ’ হিসেবেই এই পদক্ষেপ। মার-এ-লাগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা মাটির নিচ থেকে বিপুল সম্পদ তুলে আনব। তারা আমাদের সব জ্বালানি অধিকার, সব তেল নিয়ে গিয়েছিল। আমরা সেটা ফেরত চাই।’

ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরও ট্রাম্প আসলে কী করতে চান, তা স্পষ্ট নয়। তিনি মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে সেখানে ‘বিলিয়ন ডলার’ বিনিয়োগে উৎসাহ দিয়েছেন। তবে একসময় দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদনকারী ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প এখন ভগ্নদশায়—উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেলে। অবকাঠামোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।

বিশ্লেষকদের মতে, উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উৎপাদন ফেরাতে অন্তত পাঁচ বছর ও বিপুল বিনিয়োগ লাগবে। তা ছাড়া পাশের দেশ গায়ানার তুলনায় ভেনেজুয়েলার অতিভারী তেল উত্তোলন অনেক ব্যয়বহুল। ড্রেজনারের মন্তব্য, ‘আমার সোজাসাপটা মূল্যায়ন হলো, মার্কো রুবিও মাদুরোকে সরাতে চেয়েছিলেন এবং তেলকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ট্রাম্প হয়তো মনে করেন সবটাই তেল নিয়ে, কিন্তু তিনি ভুল করছেন।’

লাতিন আমেরিকাবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কার্সি গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী স্টেফানি জাঙ্গার-মোয়াটও একই মত পোষণ করেন। তাঁর ভাষায়, ‘তেল হয়তো একটি বোনাস ছিল, মাদক-সন্ত্রাসবাদ হতে পারে যুক্তি। কিন্তু মূল বিষয়টি ছিল মার্কিন ক্ষমতা; আর কিছু নয়।’

আমেরিকার ‘পেছনের উঠান’ বলে পরিচিত অঞ্চলে সম্পদ ঘিরে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে, এমনটি পূর্বাভাস দিচ্ছেন জাঙ্গার-মোয়াট। লাতিন আমেরিকায় তেল ও খনিশিল্প—উভয় ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানিগুলোর ব্যাপক স্বার্থ রয়েছে। ব্যাটারি শিল্পের জোগান নিশ্চিত করতে তারা আর্জেন্টিনা, চিলি ও বলিভিয়ার তথাকথিত ‘লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেলে’ বিনিয়োগ করেছে এবং চিলির তামা ও পেরুর লৌহ আকরিক খাতেও তাদের উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব আছে।

জাঙ্গার-মোয়াট বলেন, ট্রাম্প যদি পানামা খালের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নেন, যে খাল দিয়ে বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ পরিচালিত হয় এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ওপর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সীমিত করতে চাপ দেন, তবে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘স্বল্প মেয়াদে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই দেশগুলো, যারা মাঝখানে আটকে আছে। কারণ, তারা সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও দর-কষাকষির ক্ষমতা কম।’

শুধু লাতিন আমেরিকাতেই নয়, সম্পদের প্রশ্নে ওয়াশিংটনের শক্ত অবস্থানের প্রভাব পড়ছে অন্য অঞ্চলগুলোতেও। গত এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। যার আওতায় একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠন হবে এবং নতুন খনিজ ও তেল প্রকল্প থেকে আসা রয়্যালটির ৫০ শতাংশ সেখানে জমা হবে। ধারণাটি হলো, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বদলে বাণিজ্যিক স্বার্থের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে প্রণোদিত করা, যাতে ভবিষ্যতে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে ইউক্রেনকে রক্ষা করা যায়।

ডিসেম্বরে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। এর আওতায় ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় রুয়ান্ডার সঙ্গে নাজুক শান্তিচুক্তির বিনিময়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে খনিজ সম্পদে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও সুইস ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান মারকুরিয়া দেশটির খনিজ প্রকল্পে সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন ডলার করে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। কঙ্গোতে বিশ্বের অন্তত অর্ধেক কোবাল্ট মজুত রয়েছে এবং চিলির পর দেশটি তামা উৎপাদনে দ্বিতীয় বৃহত্তম।

আফ্রিকার গ্রেট লেকস অঞ্চলে ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা পিটার ফাম বলেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো কঙ্গোর কিছু খনিজকে চীনা সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে বের করে আনা। তাঁর মতে, চীন বা উপসাগরীয় দেশগুলোর গভীর পকেটের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য ওয়াশিংটনের সমর্থন জরুরি। কারণ, তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারে এবং প্রয়োজনে লোকসানেও কাজ চালাতে পারে। ফামের কথায়, ‘আমরা সব সময় অ্যাডাম স্মিথের নিখুঁত পৃথিবীতে থাকি না।’

আফ্রিকায় জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ধাতুর বিশাল মজুত রয়েছে, যার মধ্যে কোবাল্ট, তামা, নিকেল, লিথিয়াম ও ফসফেট উল্লেখযোগ্য। দ্য এলিমেন্টস অব পাওয়ার—বইয়ের লেখক নিকোলা নিয়ারখোস এই প্রতিযোগিতাকে ‘ব্যাটারি যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, সম্পদ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা পেছনে ফেলে দিয়েছে চীন। তাঁর ভাষায়, ‘তেলের মতোই ব্যাটারি শক্তি ক্রমেই রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।’ তাঁর যুক্তি, দ্রুত পরিবর্তনশীল নতুন প্রযুক্তিতে চীন যেখানে বাজি ধরছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্তভাবে অতীতের ওপর নির্ভর করে যাচ্ছে।

কৌশলবিদ ও আলফাজিও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরাগ খান্না বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা লড়াইয়ে নেমেছে এক্সিম ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে (যা একটি রপ্তানি ঋণ সংস্থা) এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইডিএফসি) কাজে লাগিয়ে। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় গঠিত এই সংস্থার লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগে অর্থায়ন। আইডিএফসি তার অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়িয়ে ২০৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার চেষ্টা করছে, বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে কার্যক্রম জোরদার করতে।

খান্নার মতে, ‘মার্কিন সরকার এখন কৌশলগত উদ্দেশ্য নিয়ে একটি নমনীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করছে। এটা বৈধ এবং পুরোপুরি যুক্তিসংগত। সত্যি বলতে, এটা ইউরোপীয় সরকার, জাপান ও চীন যে শিল্পনীতি দশকের পর দশক ধরে অনুসরণ করে আসছে, তারই এক উন্নত রূপ।’

বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন উদ্যোগকে দেখা যেতে পারে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। ওই উদ্যোগের মাধ্যমে বেইজিং বহু দেশে অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে, যা প্রায়ই কাঁচামাল নিজ দেশে ফেরত আনার পথ তৈরি করেছে।

আফ্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে প্রতিযোগিতার গবেষক এবং প্যারিসের সায়েন্সেস পো’র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিকার্দো দে অলিভেইরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর কিছু ঝুঁকি থাকে। তবে সুবিধাও কম নয়। তাঁর ভাষায়, ‘করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এগোতে পারে এই নিশ্চয়তা নিয়ে যে মার্কিন সরকার তাদের পেছনে আছে। তাদের বিনিয়োগে আঘাত এলে তারা সত্যিই নৌবহর পাঠাবে।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাজার ব্যবস্থার এক ভণ্ড ও দ্ব্যর্থক পাহারাদার থেকে সরে এসে এখন একেবারে আগ্রাসী ও আপসহীন ভূরাজনৈতিক খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছে।’

ট্রাম্প প্রশাসন সতর্কভাবে বাইডেন যুগের একটি পরিকল্পনাকেও সমর্থন দিচ্ছে—অ্যাঙ্গোলার আটলান্টিক উপকূলে জাম্বিয়া ও কঙ্গো থেকে তামা, কোবাল্ট ও অন্যান্য খনিজ পরিবহনের সুবিধার্থে তথাকথিত লোবিটো করিডোরে অর্থায়নের উদ্যোগ। কিছু কোম্পানি ওয়াশিংটনের নতুন খনিজ নিরাপত্তা নীতিকে সামনে রেখে বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইভানহো আটলান্টিক গিনি থেকে লাইবেরিয়া হয়ে উচ্চমানের লৌহ আকর পরিবহনের জন্য ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প উপস্থাপন করেছে, যাকে তারা ‘চীনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হওয়ার বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার’ উপায় হিসেবে তুলে ধরছে।

তবে করপোরেট দৃষ্টিকোণ থেকে হোয়াইট হাউসের এই নতুন নীতির ঝুঁকিও রয়েছে। রিও টিন্টো ও মার্স্কের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী এবং বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের ফেলো ইয়াকব স্টাউসহোম বলেন, ভূরাজনীতি যখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন প্রধান নির্বাহীদের ভূমিকাও বদলাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যবসায়িক নেতাদের এখন ভিন্নভাবে ভাবতে হচ্ছে।’

খনি কিংবা তেল-গ্যাস দুই ক্ষেত্রেই নতুন প্রকল্প উন্নয়নে দীর্ঘ সময় লাগে। একটি খনির গড় আয়ুষ্কাল প্রায় ৩০ বছর। ফলে সম্পদ কোম্পানিগুলোকে নিজ দেশে সরকার বদলালেও স্বাগতিক দেশের সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জোট গড়ে তুলতে হয়। স্টাউসহোম বলেন, ‘প্রশ্ন হলো—এটা কি সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা?’ এ সময় তিনি ইঙ্গিত করেন, ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে আবারও পরিবর্তন আসতে পারে। সায়েন্সেস পোর অলিভেইরাও এই নতুন নীতির স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান। তাঁর মতে, ‘এটা শুধু চুক্তির কৌশল নয়; বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি জোট গঠনের।’

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাস্তবে সরবরাহ শৃঙ্খল আলাদা রাখা সব সময় সহজ নয়; যেমন ভেনেজুয়েলার তেল যেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই যায়, বা কোনো মার্কিন কোম্পানির উৎপাদিত কোবাল্ট যেন চীনা রিফাইনারিতে না পৌঁছায়। পণ্যবাজার, টাকার মতো পরস্পর বিনিময়যোগ্য। বিশ্বায়িত পুঁজির যুগে কোনো কোম্পানির জাতীয় পরিচয়ও সব সময় স্পষ্ট নয়। কঙ্গোর কাওমা-কাকুলা বিশাল তামা খনির প্রধান মালিক কানাডীয় কোম্পানি ইভানহো মাইনসের প্রায় ৩০ শতাংশ মালিকানা চীনের হাতে।

আলফাজিওর খান্না বলেন, আফ্রিকায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী অবকাঠামো প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতার চেয়ে পরিপূরক হিসেবেই কাজ করতে পারে। অন্যদিকে কিছু নির্বাহী আরও আশাবাদী। তাদের মতে, সেমিকন্ডাক্টর বা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহৃত খনিজের কৌশলগত গুরুত্ব প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে যে গভীরভাবে জড়িত, তা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অবশেষে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। অ্যাংলো আমেরিকানের সাবেক প্রধান নির্বাহী মার্ক কাটিফানি বলেন, ‘রাজনীতিবিদেরা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছেন, বিশ্বটা আসলে কীভাবে চলে।’

গত বছরের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দেয়, তারা ‘বিশ্বায়ন ও তথাকথিত মুক্তবাণিজ্যের ওপর নেওয়া অত্যন্ত ভুল ও ধ্বংসাত্মক বাজি’ থেকে সরে আসছে। ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল ইয়রগিন বলেন, বিনিয়োগ কোথায় যাবে, তা নির্ধারণে বাজার সব সময় ভূমিকা রাখবে। তবে কিছু একটা বদলে গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘বিশ্বজুড়ে খনিজের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অনেক বেশি শক্ত অবস্থান নিতে চায়। আগে সরবরাহ শৃঙ্খল মানেই ছিল দক্ষতা। এখন তা রাজনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আইসিসি থেকে বিসিবি বছরে আসলে কত টাকা পায়

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটে ইরান, বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পতুষ্টি করছে বললেন খামেনি

খামেনির ছবিতে আগুন দিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন ইরানি নারীরা—নেপথ্যে কী?

ছয়জনের লিফটে বরসহ ১০ জন উঠে আটকা, ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় উদ্ধার

‘রাতারাতি’ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম জাপান—চীনের বিস্ফোরক দাবি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত