Ajker Patrika

ভারতে জেন-জিদের ‘তেলাপোকা পার্টি’র অভাবনীয় উত্থান কিসের ইঙ্গিত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ১৫: ৫২
ভারতে জেন-জিদের ‘তেলাপোকা পার্টি’র অভাবনীয় উত্থান কিসের ইঙ্গিত
ভারতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় তুলেছে ককরোচ জনতা পার্টি। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মতো ঐতিহ্যগতভাবে উচ্চ-আবেগীয় এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের সংস্কৃতিতে অতি সম্প্রতি এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন মাসকট বা প্রতীকের আবির্ভাব ঘটেছে—‘তেলাপোকা’ (Cockroach)। অত্যন্ত ঘাতসহ, ঘৃণিত অথচ পারমাণবিক যুদ্ধেও টিকে থাকতে সক্ষম বলে পরিচিত এই সাধারণ পতঙ্গটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি ভার্চুয়াল আন্দোলন মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোটি তরুণকে একই ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামের এই আপাত-কৌতুকপূর্ণ মঞ্চটি এখন আর কেবল মিমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ভারতের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির চরম বিকাশ এবং রাজনৈতিক অনীহার এই মেলবন্ধনে ভারতের রাজনীতিতে এই নতুন তরঙ্গের নেপথ্যের কারণ, এর সামাজিক অভিঘাত এবং রাজনৈতিক তাৎপর্যের নানা দিক নিয়ে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে গভীর বিশ্লেষণ।

এই অভূতপূর্ব ঘটনার পেছনে রয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর একটি বিতর্কিত মন্তব্য। ১৫ মে আদালতে শুনানির সময় তিনি কর্মহীন যুবসমাজ এবং অ্যাক্টিভিস্টদের পরোক্ষভাবে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

বিচারপতি তাঁর দীর্ঘ ক্ষোভ প্রকাশে বলেন, ‘আজকাল কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের কোনো কর্মসংস্থান নেই... তাদের কেউ মিডিয়া, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া বা আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট সেজে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করে।’

যদিও পরবর্তী সময় তীব্র সমালোচনার মুখে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, প্রধান বিচারপতির মন্তব্যটি কেবল ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী’ আইনজীবীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, সাধারণ তরুণদের উদ্দেশে নয়। কিন্তু ততক্ষণে এই বয়ানটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দেয়। তরুণেরা বিচারপতির এই অবমাননাকর রূপকটিকে প্রতিরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেন। তাঁরা বলতে শুরু করেন—‘হ্যাঁ, আমরা তেলাপোকা। কারণ, সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা বেঁচে থাকি।’

বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে জনসংযোগ নিয়ে অধ্যয়নরত ৩০ বছর বয়সী ভারতীয় ছাত্র অভিজিৎ দিপক ১৬ মে এই সিজেপির যাত্রা শুরু করেন। দিপকের রাজনৈতিক যোগাযোগে পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে; তিনি ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির মিমভিত্তিক ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের অন্যতম কারিগর ছিলেন।

সিজেপি নিজেকে কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করে না। তবে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইশতেহার ও সদস্যপদের শর্তে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আধুনিক তরুণের হতাশাগুলোকে রসবোধের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন—

যোগ্যতা: আবেদনকারীকে অলস, বেকার ও সার্বক্ষণিক অনলাইনে অ্যাক্টিভ থাকতে হবে।

মূল দাবি: আপাত-কৌতুকপূর্ণ বয়ানের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পাঁচটি কঠিন দাবি—প্রশাসনিক জবাবদিহি, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প নয়, বরং এটি একটি ‘সেফটি ভালভ’ বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের ডিজিটাল মাধ্যম।

সিজেপির উত্থানের গতিবেগ ডিজিটাল যুগের যেকোনো রাজনৈতিক প্রচারণাকে হার মানিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৯০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার মাত্র ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন।

এই ভার্চুয়াল ঝড় দেখে রাষ্ট্রযন্ত্র চুপ থাকেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সিজেপির দুই লাখের বেশি অনুসারী থাকা এক্স অ্যাকাউন্টটি ভারত সরকারের আইনি অনুরোধের পর ভারত অঞ্চলে ব্লক করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি প্রমাণ করে, ক্ষমতাসীন দল এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে ও ভয়ের চোখে দেখছে।

ভারতের বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই (প্রায় ৭০ কোটি) অনূর্ধ্ব-৩০ বছর বয়সী। তবে এই বিশাল যুবশক্তি বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বর্তমানে মারাত্মক কর্মসংস্থান সংকটের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৯ শতাংশ ভারতীয় তরুণ প্রচলিত রাজনীতি ও রাজনৈতিক আলোচনা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলেন। মাত্র ১১ শতাংশ তরুণের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সদস্যপদ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করার পরেও সম্মানজনক চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার নিয়মিত প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ভারতীয় তরুণদের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। সিজেপি এই বিশাল ‘বিচ্ছিন্ন’ ও ‘উপেক্ষিত’ জেন-জি যুবগোষ্ঠীকে এমন একটি ভাষা দিয়েছে যা তারা বুঝতে পারে—মিম ও বিদ্রূপের ভাষা।

দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক তুলনা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়বিরোধী আন্দোলন, নেপালের রাজনৈতিক রদবদল এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, কর্মহীন ও ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম কত দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী সরকারকে পতন ঘটাতে পারে।

ভারতে এখনো সরাসরি রাস্তায় রাজপথ কাঁপানো কোনো বিপ্লব দেখা না গেলেও, সিজেপি সেই আগ্নেয়গিরির ভেতরের লাভার মতোই কাজ করছে। অভিজিৎ দিপক যেমনটি বলেছেন, ‘জেন-জি প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর আশা ছেড়ে দিয়েছে। তারা এমন রাজনৈতিক ফ্রন্ট চায়, যা তাদের নিজেদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।’

বৈশ্বিক রাজনৈতিক রূপান্তর ও ‘মিম রাজনীতি’

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিদ্রূপাত্মক রাজনীতি থেকে পরবর্তীকালে বড় ধরনের রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হয়েছে। ইতালিতে কৌতুক অভিনেতা বেপ্পে গ্রিলোর ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন পরবর্তীকালে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্টে’ রূপ নেয়। এ ছাড়া ইউক্রেনে টেলিভিশন শোতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিনয় করা কমেডিয়ান ভলোদিমির জেলেনস্কি পরবর্তীকালে দেশটির বাস্তব জীবনের প্রেসিডেন্ট হন।

ভারতের প্রেক্ষাপটে সিজেপিকে সমালোচকেরা কেবল ‘ডিজিটাল ড্রামা’ বা ছদ্মবেশী রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা হিসেবে দেখলেও, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে এটি ভারতীয় রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে এক গভীর স্থায়ী রেখাপাত করে যাচ্ছে।

জীববিজ্ঞান বলে, তেলাপোকা সব ধরনের বৈরী পরিবেশেও খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ভারতীয় তরুণেরা নিজেদের এই উপাধিতে ভূষিত করে মূলত এটাই বোঝাতে চেয়েছে যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানহীনতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনি চোখরাঙানি সত্ত্বেও তারা বেঁচে থাকবে এবং নিজেদের অধিকার আদায় করবে।

সিজেপি একটি ট্রেন্ড হিসেবে হয়তো কালের নিয়মে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি যে গভীর যুব-বিচ্ছিন্নতার ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে, তা সহজে নিরাময় হওয়ার নয়। ২০২৬ সালের এই মে মাসে এসে ভারতের রাজনীতিতে স্লোগানের জায়গা নিয়েছে মিম, আর রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় ইশতেহারকে টেক্কা দিচ্ছে এক অবহেলিত পতঙ্গের ব্যঙ্গাত্মক বয়ান।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

রাতভর উত্তাল চট্টগ্রাম: পুলিশের পোশাক পরিয়ে সরানো হয় ধর্ষণে অভিযুক্তকে, রাখা হয়েছে কোথায়?

তথ্য গোপন করে ১৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল তিনি

স্থানীয় নির্বাচনে বড় পরিবর্তন: থাকছে না পোস্টার ও দলীয় প্রতীক, অক্টোবরে ভোটের প্রস্তুতি

যৌথ পরিবারে কোরবানি কীভাবে দিতে হয়, বিধান কী

ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা, অভিযোগের বিষয়ে যা বলছে বিএনপি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত