Ajker Patrika

গ্রিনল্যান্ড বিতর্কের শতবর্ষ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্বীপ বেচে দেয় ডেনমার্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
গ্রিনল্যান্ড বিতর্কের শতবর্ষ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্বীপ বেচে দেয় ডেনমার্ক
টাকা দিয়ে না হলে বলপ্রয়োগে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চান ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ড কেনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে তুমুল আলোচনা ও ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এক শতবর্ষী ইতিহাস। বর্তমান সময়ে কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড কেনাবেচার বিষয়টি অবাস্তব মনে হলেও, আজ থেকে ১০৮ বছর আগে ঠিক এমন একটি বড় ভূখণ্ড ডেনমার্কের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯১৭ সালের সেই ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমেই আজকের ‘ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস’ আমেরিকার মানচিত্রে যুক্ত হয়।

ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত তিনটি প্রধান দ্বীপ—সেন্ট থমাস, সেন্ট জন এবং সেন্ট ক্রস—তৎকালীন সময়ে ‘ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ নামে পরিচিত ছিল। ডেনমার্ক দীর্ঘ সময় ধরে এই দ্বীপগুলো শাসন করে আসছিল। সেখানে মূলত আখ চাষ ও চিনি শিল্প গড়ে উঠেছিল। তবে উনিশ শতকের শেষের দিকে চিনির বাজার ধসে পড়লে ডেনমার্ক এই ভূখণ্ড ধরে রাখার আগ্রহ হারায়।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই দ্বীপগুলোর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে পানামা খালের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌ-ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এই দ্বীপগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সেন্ট থমাসের বন্দরটি ছিল সেই সময়ের অন্যতম সেরা প্রাকৃতিক বন্দর।

যুক্তরাষ্ট্র ১৮৬৭ সাল থেকেই এই দ্বীপগুলো কেনার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমেরিকান গৃহযুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে তা বারবার থমকে যায়। পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। যুক্তরাষ্ট্রের ভয় ছিল, জার্মানি যদি ডেনমার্ক দখল করে নেয়, তবে তারা ক্যারিবীয় এই দ্বীপগুলোতে সাবমেরিন ঘাঁটি স্থাপন করে আমেরিকার পূর্ব উপকূলে হামলা চালাতে পারবে।

জার্মানিকে ঠেকানোর এই তাগিদ থেকেই ১৯১৬ সালের আগস্ট মাসে দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার পর দুই দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। ডেনমার্ক শুরুতে তৎকালীন ৫০ মিলিয়ন ডলার চাইলেও শেষ পর্যন্ত ২৫ মিলিয়ন ডলারে সমঝোতা হয়।

১৯১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি বিকেলে ডেনমার্কে পতাকা নামিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
১৯১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি বিকেলে ডেনমার্কে পতাকা নামিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

১৯১৬ সালের ৪ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে ঐতিহাসিক ‘কনভেনশন বিটুইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অ্যান্ড ডেনমার্ক’ সই হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, ২৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনার বিনিময়ে ডেনমার্ক তার এই ক্যারিবীয় ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হয়। বর্তমান বাজারমূল্যে এই অর্থের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান হতে পারে।

১৯১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ভূখণ্ড হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেদিন বিকেলে ড্যানিশ পতাকা নামিয়ে মার্কিন পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং দ্বীপগুলোর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস’। হস্তান্তর অনুষ্ঠানের সময় সেন্ট থমাসের নাগরিকেরা অশ্রুসিক্ত নয়নে ড্যানিশ রাজতন্ত্রকে বিদায় জানিয়েছিল।

১৯১৭ সালের ৩১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বীপ হস্তান্তর করে ডেনমার্ক। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
১৯১৭ সালের ৩১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বীপ হস্তান্তর করে ডেনমার্ক। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে পুনরায় ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিল যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ড্যানিশ সরকার সরাসরি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়, বরং এটি গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।’ কিন্তু ১৯১৭ সালের সেই সফল চুক্তি আজও মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক প্রয়োজনে ভূখণ্ড কেনাবেচা এক সময় কতটা সাধারণ ঘটনা ছিল।

গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে খনিজ সম্পদ ও আর্কটিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ১০৮ বছর আগের সেই ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ কেনা এবং আজকের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহের পেছনে আমেরিকার একই কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯১৭ সালের সেই দ্বীপ কেনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় কৌশলগত সাফল্য। এর ফলে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য যেমন নিশ্চিত হয়েছিল, তেমনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রু পক্ষকে কৌশলগতভাবে দুর্বল রাখা সম্ভব হয়েছিল। আজ ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র এবং সামরিক অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বর্তমান বিতর্কটি আসলে সেই পুরোনো মার্কিন সম্প্রসারণবাদী ইতিহাসেরই একটি আধুনিক প্রতিচ্ছবি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ভবঘুরেকে যৌনাচারে লিপ্ত দেখলেই সানডে মানডে ক্লোজ করে দিতাম’, পুলিশকে ‘সাইকো’ সম্রাট

অভিজ্ঞতা ছাড়াই সিটি ব্যাংকে চাকরি, নিয়োগ ১৫ জেলায়

ফের তাপমাত্রা কমবে, কবে থেকে জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর

‘বাসররাতে মুখ ধোয়ার পর নববধূকে চেনা যাচ্ছে না’, কনে ফেরত, বর কারাগারে

জামায়াতের পলিসি সামিটে ভারতসহ ৩০ দেশের প্রতিনিধি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত