Ajker Patrika

ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন: মনরো ডকট্রিনের নয়া সংস্করণ দেখাচ্ছেন ট্রাম্প

আব্দুর রহমান 
ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন: মনরো ডকট্রিনের নয়া সংস্করণ দেখাচ্ছেন ট্রাম্প
মনরো ডকট্রিনের নতুন ভার্সনের প্রয়োগ হিসেবেই যেন ভেনেজুয়েলায় হামলা করেছেন ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

একুশ শতকের শুরু থেকেই বৈশ্বিক রাজনীতির পট দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ক্রমেই বহু মেরু বিশ্বের জোরালো ধারণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য খর্ব হওয়া। বৈশ্বিক আধিপত্যের পাট চুকিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ‘নিজ আঙিনা’ বলে পরিচিত পশ্চিম গোলার্ধ অর্থাৎ দুই আমেরিকা মহাদেশে নিজ আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে। সেই আকাঙ্ক্ষায় নাকের ডগায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভেনেজুয়েলা। সেই বাধা দূর করতেই যুক্তরাষ্ট্র আজ (৩ জানুয়ারি) হামলা চালায় দেশটিতে।

হামলার কিছুক্ষণ পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে দেশের বাইরে উড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় একটি ‘বৃহৎ আকারের হামলা’ চালিয়েছে এবং এর মাধ্যমেই মাদুরোকে বন্দী করা সম্ভব হয়েছে।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলা এবং দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোর ওপর বড় ধরনের একটি সফল হামলা চালিয়েছে। মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে বন্দী করা হয়েছে এবং তাঁদের দেশের বাইরে উড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে এই অভিযানটি পরিচালিত হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে। আজ সকাল ১১টায় মার-এ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। বিষয়টি নিয়ে আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’

এই হামলার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র কী তাহলে আবারও শত বছরের পুরোনো মতবাদ ‘মনরো ডকট্রিনে’ ফিরে গেল? বিশ্লেষকেরা তা-ই মনে করছেন। সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এইডেন জে সিমার্ডোন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এক মেরু বিশ্ব বিলীয়মান এবং ইউরেশিয়ার ডিটারেন্ট বা বাইরের শক্তিকে প্রতিরোধ করার সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় ওয়াশিংটনের শেষ কার্যকর প্রকল্প হলো—নিজেদের তথাকথিত “পেছনের আঙিনা” কাবু করা। দেশটির নীতিনির্ধারণী মহল বুঝতে পেরেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলা করে পারবে না। বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য বিস্তার ব্যর্থ হলে তাই বিকল্প পরিকল্পনা হলো—অন্তত পশ্চিম গোলার্ধ নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই কৌশলটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আরও দ্রুত এগিয়ে চলছে।’ এরই ধারাবাহিকতায় হামলা হলো ভেনেজুয়েলাতে।

পশ্চিম গোলার্ধে নিজ নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করার জন্য, ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কারণ, দেশটির আছে বিশ্বের সর্বোচ্চ তেলের মজুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা ভেনেজুয়েলার ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ সরকার। অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে সরকার পতনে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এখন একমাত্র বিকল্প সামরিক শক্তি প্রয়োগ। কিন্তু এটি বিপরীত ফল দিতে পারে। বিশেষ করে, আঞ্চলিক মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেতে পারে এবং ভেনেজুয়েলাকে সাহায্য করতে পারে বেইজিং, মস্কো এবং তেহরান। তখন ট্রাম্পকে অন্য বিকল্প খুঁজতে হবে। যদিও ভেনেজুয়েলায় হামলার পর এমন কোনো সহায়তার ইঙ্গিত তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়নি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যুক্তরাষ্ট্রকে অনন্য সাধারণ বৈশ্বিক আধিপত্য এনে দিয়েছিল। শক্তি-সামর্থ্যের শীর্ষে থাকা অবস্থায় ওয়াশিংটন বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। কুয়েত থেকে ইরাককে বের করে দিয়েছে, যুগোস্লাভিয়া ভেঙেছে এবং হাইতির শাসন পরিবর্তন করেছে। এসবই করা হয়েছে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য।

অতীতের ঘটনা থেকে আত্মবিশ্বাসী হয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করেন পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করার জন্য। দ্রুত বিজয় না পাওয়ায় এবং স্থানীয় প্রতিরোধের মুখে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই দশক আটকে পড়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের মার্কিনরা বুঝে যায়, বিশ্বের জ্বালানি ভান্ডার নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে।

একই সময়ে, চীন মার্কিন করপোরেট সিস্টেম আউটসোর্স করে তার অর্থনীতি দ্রুত শক্তিশালী করেছে। এই সময়েই রাশিয়া চেচেন বিদ্রোহ দমন করেছে, প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং জর্জিয়া, মলদোভা ও ইউক্রেনে ন্যাটোর সম্প্রসারণে বাধা দিয়েছে। এই অবস্থায় বহু মেরু বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পরিবর্তে, ওয়াশিংটন আরও এক মেরু ব্যবস্থায় জোর দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় তারা রুশ সীমান্তের দিকে ন্যাটো সম্প্রসারণ, পূর্ব ইউরোপ ও ককেশাসে কালার রেভোলিউশনকে সমর্থন, দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ায় মিত্রদের সাহায্য করেছে। এসব মূলত যুক্তরাষ্ট্রের এক মেরু ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা।

এসব প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেনে নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠেছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ তেমন প্রভাব ফেলেনি। বরং, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশগুলো ডলারের ব্যবহার কমিয়েছে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন হয়েছে, কিন্তু গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, হামাসের প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন বাড়িয়েছে।

ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ফাদি লামা ২০২২ সালে লিখেছিলেন, ‘রাশিয়া, ইরান, চীনের (আরআইসি) ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রভাব বিবেচনা করে পশ্চিমের একমাত্র কার্যকর কৌশল হলো—বিশ্বকে (বিভিন্ন প্রভাব বলয়ে) বিভক্ত করে প্রতিযোগিতা সমাপ্ত করা।’

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি অনেকেই ভুলভাবে ‘শান্তিপ্রিয়’ বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। চীন ও রাশিয়াকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্প এখন আমেরিকা মহাদেশকে—পাতাগোনিয়া থেকে গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত—ওয়াশিংটনের প্রভাববলয়ে আনতে চাচ্ছেন।

এটি আসলে মনরো নীতিরই নতুন সংস্করণ। প্রায় ২০০ বছর ধরে এই নীতিই বলছে, পশ্চিম গোলার্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ‘দায়িত্বভুক্ত’ এলাকা। তবে এবার ট্রাম্প তা প্রকাশ্যে বলছেন এবং হুমকি দিয়েছেন—প্রয়োজনে সামরিক শক্তি বাড়িয়ে সংযুক্তিকরণ নিশ্চিত করবেন এবং তা শুরুও করেছেন। দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তিনি কানাডা, গ্রিনল্যান্ড ও পানামাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান। উদারপন্থী বিশ্লেষকেরা একে পাগলামি বললেও এতে বাস্তব ফল এসেছে।

কানাডা সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের চাপে গ্রিনল্যান্ডে সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে, যাতে চীন ওই অঞ্চলের খনিজসম্পদে প্রবেশাধিকার না পায়। পানামা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) প্রকল্প বাতিল করেছে এবং হংকংভিত্তিক সিকে হাচিনসনের সঙ্গে খাল ব্যবস্থাপনার চুক্তি বাতিল করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে মেক্সিকো চীনা পণ্যে শুল্ক বাড়াতে সম্মত হয়েছে। আর্জেন্টিনা ৪০ বিলিয়ন ডলার মার্কিন সহায়তা পেয়েছে, যা তাদের মার্কিনপন্থী সরকারকে জাতীয় নির্বাচনে জিততে সাহায্য করেছে। কোস্টারিকা ও গুয়েতেমালা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অভিবাসীদের ফেরত নিতে রাজি হয়েছে, বিনিময়ে তারা কম শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এভাবে ঘুষ, হুমকি ও সামরিক ভয়ের মুখে একে একে অঞ্চলটির দেশগুলো আবারও ওয়াশিংটনের প্রভাব বলয়ে ফিরছে।

তবে ব্যতিক্রম ছিল ভেনেজুয়েলা। ২০০২ সাল থেকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তনের চেষ্টার, নিষেধাজ্ঞা আর অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে টিকে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেনেজুয়েলার সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দেয়। এর ফলে দেশটির জিডিপি ৭৪ শতাংশ কমে যায়, মুদ্রাস্ফীতি দুই মিলিয়ন শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, আর প্রায় ৭৯ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালায়। তখন মনে হয়েছিল, সরকার ভেঙে পড়া শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু তা হয়নি।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রথমত, ভেনেজুয়েলার টিকে থাকা অন্য দেশগুলোকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। ইতিমধ্যে ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, হন্ডুরাস, মেক্সিকো ও নিকারাগুয়ায় বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ইকুয়েডর ও পেরুর গণবিক্ষোভও ইঙ্গিত দিচ্ছে—তারা শিগগিরই নির্বাচনের মাধ্যমে বা লড়াইয়ের পথ ধরে এই ধারায় যোগ দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উল্টো ফল দিয়েছে। এই পদক্ষেপ চীন ও রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পেছনের উঠানে’ প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে।

চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্র ফের মনরো ডকট্রিনের দ্বারস্থ হয়েছে। ১৮২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইউরোপ যেন লাতিন আমেরিকার দেশে হস্তক্ষেপ না করে; বিনিময়ে আমেরিকাও ইউরোপের ঝামেলায় ঢুকবে না। শুনতে খুব ভদ্র, মুক্তবিশ্বের ধ্বজাধারী আর ন্যায়ের কথা মনে হয়, যেন দুনিয়ায় ন্যায়বিচারের দেবদূত নেমে এসেছিল। বাস্তবে এটি ছিল একধরনের ক্ষমতা প্রদর্শনের নোটিশ—দুনিয়ার এই পাশটা আমাদের এলাকা, বাইরের কেউ নাক গলাবে না।

প্রথমে এটা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার ভাষা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে গল্প উল্টে যায়। যুক্তরাষ্ট্রই হয়ে ওঠে এই অঞ্চলের ‘অঘোষিত অভিভাবক’। একধরনের কর্তৃত্ববাদী মোড়ল—যে সবসময় বলে, ‘যা করছি তোমাদের ভালোর জন্যই করছি’। এই নীতির আড়ালে মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকায় কত সরকার ফেলা হয়েছে, কত সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে, কত দেশকে ‘গণতন্ত্র রক্ষার নামে’ অনুগত শাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় তাকালেই পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের শেষ দিকে যে নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে—তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে একধাপ কম ‘শান্তির প্রতিষ্ঠাতা’, তবে একধাপ বেশি ‘পেশীশক্তির স্থপতি’ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধ তথা পুরো আমেরিকা মহাদেশে ‘মার্কিন প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করতে চাচ্ছে। এটি করতে গিয়ে তারা মনরো মতবাদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছে।

নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়, ‘আমরা এই অঞ্চলের সরকার, রাজনৈতিক দল এবং আন্দোলনগুলোকে পুরস্কৃত এবং উৎসাহিত করব, যারা আমাদের নীতি ও কৌশলের সঙ্গে ব্যাপক অর্থে সংগতিপূর্ণ থাকবে।’ ট্রাম্প ইতিমধ্যেই লাতিন আমেরিকায় রক্ষণশীল রাজনীতিকদের প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে এবং ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের অধীনে আর্জেন্টাইন অর্থনীতিকে ৪০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে উদ্ধার করে এই কৌশল কার্যকর করতে চাচ্ছেন। আর শাস্তির খড়গ নেমে এসেছে ভেনেজুয়েলার ওপর।

নথিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ‘এই-গোলার্ধের বাইরের প্রতিযোগীদের’ পশ্চিম গোলার্ধে ‘সামরিক বা অন্যান্য হুমকিমূলক সক্ষমতা প্রদর্শন করা কিংবা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলো নিজেদের দখলে নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অস্বীকার’ করবে। সোজা কথায়, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো শক্তিকেই প্রভাব বিস্তার করার জন্য স্বাগত জানাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আমেরিকান জাতীয় সুরক্ষার কাছে যেসব রণাঙ্গনের আপেক্ষিক গুরুত্ব সাম্প্রতিক দশকগুলোতে কমে এসেছে, সেগুলোকে সরিয়ে আনা হয়েছে এরই মধ্যে। এই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মনোযোগ কিছুটা কমিয়ে দিচ্ছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রভাববলয় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ওপর মনোযোগ দেওয়ার আমেরিকার ঐতিহাসিক কারণ কমে আসবে’।

এতদিন যা কাগজে কলমে ছিল লাতিন আমেরিকায় সেই নয়া মনরো ডকট্রিনের সামরিক প্রয়োগ শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ বিষয়ে বিশ্লেষক লুসিয়া নিউম্যান বলেন, বিশ্বের বুকে তেলের সবচেয়ে বড় মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। তবে আমেরিকা সেখানে ঢুকে স্রেফ ‘তেল দখল’ করে নেবে—বিষয়টি মোটেও তেমন সরল নয়। এটিকে দেখতে হবে আরও বৃহত্তর এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে—যাকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এক নতুন ‘মনরো ডকট্রিন’ বলে অভিহিত করছেন।

তিনি আরও বলেন, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, ওয়াশিংটন দেখতে পাচ্ছে যে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চীন, ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। আর এই দেশগুলোকে আমেরিকা নিজের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী বলেই মনে করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন প্রভাব আগের চেয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার তেলের বড় একটা অংশ এখন রপ্তানি হয় চীনে। এমনকি সেই সব ট্যাংকারে করেও তেল যাচ্ছে, যেগুলোর ওপর খোদ আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। ফলে এই সংকটের কেন্দ্রে যেমন রয়েছে তেল, ঠিক তেমনি ওয়াশিংটনের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হলো—যাদের আমেরিকা সাবেক বা বর্তমান চিরশত্রু ভাবে, সেই সরকারগুলোর সঙ্গে কারাকাসের নিবিড় মাখামাখি। এই মাখামাখি ঠেকিয়ে লাতিনে আধিপত্য নতুন করে নিশ্চিত করতেই এই হামলা এবং মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়া।

লেখক: আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত