রাজপথের লড়াকু শ্রমিক নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট: ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন যে কারণে ঐতিহাসিক

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন বামপন্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় জয়ী হয়ে তিনি দেশটির গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নতুন নজির স্থাপন করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথে তরুণদের বিক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা, বলসোনারোপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত এবং সরকারি কর্মসূচির সম্মিলিত প্রভাব লুলার এই প্রত্যাবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনের প্রথম দফার পর লুলা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁর তিন মেয়াদের মধ্যে যে সরকারকে তিনি সর্বোত্তম মনে করেন, সেই সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার পরও কীভাবে তিনি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেন, তা বুঝতে পারছেন না।
প্রথম দফার ফল ঘোষণার পর ব্রাজিলের বামপন্থী শিবিরে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। ডানপন্থী অন্য প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেওয়া ৯০ লাখ ভোটারের অধিকাংশই সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে ভোট দিতে পারেন, এমন ধারণা থেকে বিশ্লেষকদের অনেকেই তাঁর বিজয়কে প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করেছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনের পরদিন রাতেই পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রিও ডি জেনেইরোর বিপরীতে গুয়ানাবারা উপসাগরের ওপারে অবস্থিত ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষের শহর নিতেরোইয়ে ফ্লুমিনেন্স ফেডারেল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের প্রতিবাদের লক্ষ্য ছিল বলসোনারো পরিবারের আরেক সদস্যের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ঠেকানো।
ফ্লাভিও বলসোনারোর বাবা ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগে তখন গৃহবন্দী।
এর দুই দিন পর রিওর কেন্দ্রস্থলে আরেকটি ছাত্রবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে একই ধরনের বিক্ষোভ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্লেষক ও লুলা উভয়ের মূল্যায়ন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা এসব আন্দোলন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন গতি সঞ্চার করে এবং দ্বিতীয় দফার ভোটে ঐতিহাসিক বিজয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। রোববার রাতে বিজয় ভাষণে লুলা বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষায় রাস্তায় নেমে আসা ব্রাজিলের তরুণদের উদারতার জন্য আমি তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
রাজপথ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সরকারি কর্মসূচির প্রভাব
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ফাবিও ভাসকনসেলোসের মতে, লুলার বিজয়ের পেছনে রাজপথের আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার সম্মিলিত ভূমিকা ছিল। ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এই প্রথম প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা কোনো প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় জয়ী হয়ে প্রথম দফার পরাজয় উল্টে দিলেন।
নির্বাচনের সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লুলা এমন একটি ‘সুবিধা প্যাকেজ’ অনুমোদন করেন, যা নির্বাচনী আইন অনুমোদিত সীমার প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়। এর মধ্যে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সরকারের প্রধান নগদ অর্থ সহায়তা কর্মসূচির অর্থের পরিমাণ বাড়ানো এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্থপ্রদান করার সিদ্ধান্ত ছিল।
ভাসকনসেলোস ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পারানার ‘রিপ্রেজেন্টেশন অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক লেজিটিমেসি’ বা ‘প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বৈধতা’ গবেষণা দলের গবেষক। তিনি বলেন, ‘রাজপথ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রায় একই জায়গায় এসে মিশে গিয়েছিল।’
প্রথম দফার ভোটের দুই দিন পর লুলার মিত্র ও কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস ‘লুলার আর্মি’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল চালু করেন। সেখানে তিনি অডিও বার্তা, ভিডিও এবং প্রতিদিন কয়েক ডজন নির্দেশনা পাঠাতেন। এসব নির্দেশনার উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুলাপন্থী কনটেন্টের প্রচার ও কার্যকারিতা বাড়ানো। জানোনেসের ভিডিওগুলোর শুরুতে প্রায়ই শোনা যেত, ‘বন্ধুরা, জরুরি খবর!’
চ্যানেলটি চালুর প্রথম দিন শেষ হওয়ার আগেই এর অনুসারীর সংখ্যা ৬০ হাজারে পৌঁছে যায়। নির্বাচনের দিন রোববার নাগাদ অনুসারীর সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি হয়। একই সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে লুলা বলসোনারোকে ছাড়িয়ে যান। বিজয় ভাষণে লুলা জানোনেসকে ‘আমাদের জেনারেল’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষায়, জানোনেসের দায়িত্ব ছিল ‘প্রতিদিন আমাদের সৈন্যদের মনোবল চাঙা রাখা।’
নির্বাচনী প্রচারণায় জানোনেসের নিরলস ভূমিকার মধ্যে ভোটের আগের দিন ইউটিউবে টানা ২৪ ঘণ্টার সরাসরি সম্প্রচারও ছিল। অবিরাম কাজের চাপে গত সপ্তাহে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। ওই দিনটিই ছিল একমাত্র দিন, যেদিন হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলটিতে কোনো বার্তা প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে লুলার নির্বাচনী প্রচারণা দলও অনলাইন যোগাযোগের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ৮১ বছর বয়সে পা দিতে চলা লুলা নিজের মোবাইল ফোন না থাকা সত্ত্বেও সেলফি ভিডিও রেকর্ড করা শুরু করেন। রোববার রাতে তিনি জানান, তাঁকে একটি ফোন দেওয়া হয়েছে। লুলা বলেন, ‘এখন থেকে আমি ব্রাজিলের জনগণের সঙ্গে অনেক বেশি কথা বলব, প্রতিদিন বহুবার, সরাসরি।’
ভাসকনসেলোসের মতে, ‘এই তিন সপ্তাহে রাজপথ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে পরাজয়ের আবহ ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে প্রত্যাবর্তনের আশায় রূপ নেয়।’
বলসোনারোপন্থী প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনমত
ব্রাজিলের নতুন ডানপন্থী রাজনীতি নিয়ে গবেষণাকারী রাজনৈতিক বিজ্ঞানী কামিলা রোচার মতে, লুলার প্রত্যাবর্তন শুধু তাঁর নিজস্ব জনপ্রিয়তার প্রতিফলন নয়; এটি ‘ব্রাজিলের জন্য বলসোনারোপন্থী প্রকল্পের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রত্যাখ্যানের’ও প্রকাশ।
মে মাস থেকে রোচা সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোটার ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নিজেদের অধিকার হারানোর আশঙ্কা এবং বলসোনারোর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ভয় স্পষ্ট ছিল। রোচা বলেন, ‘ভোটারদের, শ্রমিকদের অধিকার হারানোর ভয় এবং বলসোনারোর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ার আশঙ্কা খুবই স্পষ্ট ছিল।’ তাঁর মতে, এ কারণেই এমন অনেক মানুষও এবার লুলাকে ভোট দিয়েছেন, যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পছন্দ করেন না।
প্রথম দফায় বলসোনারো পেয়েছিলেন ৫ কোটি ৬১ লাখ ভোট। দ্বিতীয় দফায় তাঁর ভোটসংখ্যা আরও ৩৭ লাখ বাড়ে। অন্যদিকে, লুলার ভোট প্রথম দফার ৫ কোটি ৩৯ লাখ থেকে বেড়ে দ্বিতীয় দফায় ৬ কোটি ৪২ লাখে পৌঁছায়।
লুলার ভোট ১ কোটি ৩ লাখ বাড়ার পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, প্রথম দফায় ঐতিহাসিকভাবে উচ্চমাত্রার ভোটদানে অনুপস্থিতির পর তিনি আরও বেশি ভোটারকে দ্বিতীয় দফায় ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য প্রার্থীর ভোটারদের নিজের পক্ষে টানেন। তাঁদের মধ্যে বলসোনারোর কিছু ভোটারও ছিলেন।
রোচা বলেন, ‘আমরা যেসব সিদ্ধান্তহীন ভোটারের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, তাঁদের কেউ কেউ বলেছিলেন, বলসোনারো একজন বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ, যিনি বড় ব্যবসায়ীদের পক্ষ নেন। একই সঙ্গে তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলছিলেন, তিনি জিতলে এমন এক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে মানুষ নিজেদের অধিকার হারাবে।’
বিতর্কে জড়িয়েছিলেন বলসোনারো
নির্বাচনের আগে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ফ্লাভিও বলসোনারো। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, নতুন এবং আরও রক্ষণশীল কংগ্রেসকে কাজে লাগিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করবেন এবং ব্রাজিলকে ‘পুনরায় গণতান্ত্রিক’ করে তুলবেন। এ ছাড়া দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে ফেডারেল পুলিশের দুটি তদন্তেও তাঁর নাম রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি তদন্তের আওতায় ছিলেন।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, লুলার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও তাঁর বিজয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেলসিমারা দে সুজা তেলেস বলেন, ‘লুলার পরিবর্তে অন্য কোনো প্রার্থী থাকলে বলসোনারো প্রথম দফাতেই জিতে যেতেন।’
লুলার নির্বাচনী প্রচারণার ব্যবস্থাপক মার্কো অরেলিও দে কারভালহোকে ঐতিহাসিক নির্বাচনী প্রত্যাবর্তনের কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি দ্বিধাহীনভাবে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট লুলা। আমাদের দলে একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক রয়েছেন। আমাদের দলে একজন তারকা খেলোয়াড় রয়েছেন। একেবারে এটাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’
লুলা-পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে উদ্বেগ
নির্বাচনে বিজয়ের পর ব্রাজিলের বামপন্থীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, লুলার পর নেতৃত্ব দেবেন কে? কারণ লুলা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, এটিই তাঁর শেষ নির্বাচন। রোচা বলেন, ‘এটি অত্যন্ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ এ বিষয়ে পরিচালিত জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, লুলার আধিপত্য এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁর নিজের দলেও এমন কেউ নেই, যাঁর নেতৃত্বের ক্ষমতা তাঁর সমতুল্য।’
ভাসকনসেলোস মনে করেন, লুলার পুনর্নির্বাচনী প্রচারণা ব্রাজিলের বামপন্থীদের জন্য নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। রাজপথে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘লুলার দল সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং তরুণ ও শহুরে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের আরও ভালো উপায় খুঁজে বের করতে পারে। এসব ভোটারের মনে হয়, তাঁদের উদ্বেগ ও চাহিদার কথা কেউ শুনছে না।’
লুলার এই জয় তাই কেবল একটি নির্বাচনী ফল নয়। এটি দেখিয়েছে, প্রথম দফার পরাজয় চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে না; রাজপথের জনমত, ডিজিটাল প্রচারণা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ভোটারদের অধিকার হারানোর আশঙ্কা একসঙ্গে নির্বাচনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তবে এই প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের বামপন্থীদের সামনে আরেকটি কঠিন বাস্তবতাও তুলে ধরেছে: লুলার জনপ্রিয়তা দিয়ে যে রাজনৈতিক শক্তি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, তাঁর বিদায়ের পর সেই শক্তিকে টিকিয়ে রাখার মতো নেতৃত্ব এখনো তৈরি হয়নি।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত










