Ajker Patrika

প্রথম দফায় হেরেও দ্বিতীয় দফায় কীভাবে জিতলেন ব্রাজিলের লুলা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
প্রথম দফায় হেরেও দ্বিতীয় দফায় কীভাবে জিতলেন ব্রাজিলের লুলা
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফায় ২০ লাখেরও বেশি ভোটে পিছিয়ে থেকেও ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। রোববারের (২৫ অক্টোবর) রান-অফ নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ৮০ বছর বয়সী এই নেতা। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথম দফায় দ্বিতীয় অবস্থানে থেকেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে জয়ী হওয়ার নজির গড়লেন তিনি।

বিজয় মিছিলে সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, ‘আমি শুধু আপনাদের বলতে চেয়েছিলাম, আমি আপনাদের ভালোবাসি। আগামীকাল থেকে আবার লড়াই শুরু হবে।’ তিনি আরও বলেন, সবাইকে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে পছন্দ করতে হবে না, তবে তাঁকে সবার জন্যই সরকার পরিচালনা করতে হবে।

লুলার এই জয় লাতিন আমেরিকায় ক্রমবর্ধমান ডানপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া বিভিন্ন ডানপন্থী শক্তির উত্থানের প্রেক্ষাপটে এই ফল গুরুত্বপূর্ণ।

ভোটের হিসাবে নাটকীয় পরিবর্তন

প্রথম দফায় এককভাবে কেউ ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় শীর্ষ দুই প্রার্থীকে নিয়ে নির্বাচন দ্বিতীয় ধাপে গড়ায়। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী—লুলা পেয়েছেন বৈধ ভোটের ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ—৬ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার ভোট। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ বা ৫ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার ভোট।

অথচ ৪ অক্টোবরের প্রথম দফায় ফ্লাভিও ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। লুলার পক্ষে ভোট পড়েছিল ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রথম দফায় প্রায় ২২ লাখ ভোটের ব্যবধান মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে উল্টে দেন লুলা।

দ্বিতীয় দফায় ভোটার উপস্থিতিও বেড়েছে। প্রথম দফায় ৭৮ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোটার ভোট দিলেও এবার উপস্থিতি ছিল ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটারের।

যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন লুলা

বিশ্লেষকদের মতে, লুলার প্রত্যাবর্তনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তৃণমূল পর্যায়ের প্রচার, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল প্রচারণায় কৌশলগত পরিবর্তন।

প্রথম দফায় ফ্লাভিও বলসোনারোর এগিয়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রাজিলের তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হতে শুরু করেন। তাঁদের এই উদ্যোগ পরে ‘লুলার বাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়। তাঁরা অনলাইনে প্রচার চালানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে লুলার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।

আল-জাজিরার প্রতিবেদক মনিকা ইয়ানাকিয়েভের মতে, প্রথম দফার আগে লুলার প্রচারণায় যে উদ্দীপনার ঘাটতি ছিল, দ্বিতীয় দফায় তরুণদের সক্রিয়তা তা অনেকটাই কাটিয়ে দেয়।

‘দ্য ব্রাজিলিয়ান রিপোর্ট’-এর প্রধান সম্পাদক গুস্তাভো রিবেইরো বলেন, প্রথম দফার আগে লুলার শিবির এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছিল, যেন জয় নিশ্চিত। পরে তারা ডিজিটাল প্রচারণা ও তৃণমূলের সংগঠনের দিকে মনোযোগ দেয়। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের অবস্থানও লুলা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন।

অন্যদিকে, প্রথম দফায় এগিয়ে যাওয়ার পর ফ্লাভিওর আত্মবিশ্বাস অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিতে পরিণত হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগের মতো আচরণ শুরু করে দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই ঔদ্ধত্য ভোটারদের একাংশকে বিরূপ করে তোলে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাবার নামের ওপর নির্ভর করলেও ফ্লাভিওর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও আকর্ষণ ততটা ছিল না।

এ ছাড়া প্রথম দফায় ভোট না দেওয়া অনেক ভোটার দ্বিতীয় দফায় ভোট দিতে আসেন। প্রথম দফায় প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। দ্বিতীয় দফায় বিরত ভোটারের হার প্রায় ২১ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নামে। কিছু ভোটার প্রথম দফায় ফ্লাভিওকে সমর্থন করলেও পরে লুলার দিকে ঝুঁকে থাকতে পারেন বলেও ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।

সামনে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনে জয় পেলেও লুলার সামনে কঠিন পথ অপেক্ষা করছে। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে ৫১৩টি আসনের মধ্যে ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি ও মিত্রদের ২৮০ টির বেশি আসন থাকতে পারে। সিনেটের ৮১টি আসনের মধ্যে বিরোধীদের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫০টি পর্যন্ত। ফলে আইন পাস ও সংস্কার বাস্তবায়নে লুলাকে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।

অর্থনীতিও বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলের সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আগামী বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও পরিবারের ঋণের বোঝা কমানোও তাঁর সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, লুলার বয়স প্রায় ৮১ বছর হওয়ায় তাঁর ওয়ার্কার্স পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কে দেবেন। দীর্ঘদিনের এই নেতার বিকল্প হিসেবে এখনো শক্তিশালী কোনো উত্তরসূরি সামনে আসেননি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সব মিলিয়ে, লুলার জয় শুধু একটি নির্বাচনী প্রত্যাবর্তন নয়; এটি ব্রাজিলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং বাম-ডানপন্থী শক্তির ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচনী সাফল্যকে কার্যকর শাসনে রূপান্তর করাই হবে তাঁর পরবর্তী বড় পরীক্ষা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত