Ajker Patrika

আসন্ন ভোটে জ্বালানি নিরাপত্তার অগ্নিপরীক্ষার প্রভাব ও আগামী সরকারের যত চ্যালেঞ্জ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আসন্ন ভোটে জ্বালানি নিরাপত্তার অগ্নিপরীক্ষার প্রভাব ও আগামী সরকারের যত চ্যালেঞ্জ
পরবর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে জ্বালানি নিরাপত্তা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ১২ ফেব্রুয়ারির একটি উত্তেজনাপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি হবে ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে চলে যাওয়ার পর দেশের প্রথম নির্বাচন। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে সামনে চলে এসেছে।

উচ্চমূল্যের এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি সরকারি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ধীরে ধীরে চালুর পথে এগোচ্ছে, আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অগ্রগতি সরকারি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক ধীর। সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং সেই সঙ্গে ব্যয় এমন পর্যায়ে না নিয়ে যাওয়া—যা ভোটার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের পক্ষে বহন করা কঠিন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা আগামী সরকারের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ব্যতিক্রমধর্মী ও নাটকীয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তার করা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে টানা কয়েক সপ্তাহের তীব্র আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত হন। ওই আন্দোলনে হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আন্দোলনের সূচনা হয়—সরকারি চাকরিতে বিতর্কিত কোটা ব্যবস্থায় আপত্তি থেকে। খুব দ্রুতই তা বিস্তৃত হয় শাসনব্যবস্থা, নাগরিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে সামগ্রিক ক্ষোভে। এর ফলে বাংলাদেশ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর নাগরিক আন্দোলনের মুখে পড়ে। বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকলে শেখ হাসিনা ওই বছরের আগস্টের শুরুতে ভারতে চলে যান।

তাঁর হঠাৎ বিদায়ের ফলে দেশে শূন্যতা তৈরি হয়, যা পূরণ করা হয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মাধ্যমে। স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়া এই সরকার এখন শুধু গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল একটি অর্থনীতি কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারছে কি না—সেই প্রশ্নেও তীব্র নজরদারির মুখে। ফলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি হবে এই পরীক্ষাও যে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আদৌ নতুন সরকারের বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য নীতিতে রূপ নিতে পারে কি না। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে, যা তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) থেকে শুরু করে সাধারণ পরিবারের কল্যাণ পর্যন্ত সবকিছুর ভিত্তি।

এলএনজি

গত এক দশকে বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমতে থাকায় এবং বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজি সেই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসে এবং ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতির একটি প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়। কিন্তু যে এলএনজি একসময় স্থিতিশীল সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিই এখন নতুন চাপের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুতের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হচ্ছে আমদানিকৃত জ্বালানির মাধ্যমে, যার একটি বড় অংশ এলএনজি। মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪৪ শতাংশই আসে আমদানির ওপর নির্ভর করে। বৈশ্বিক গ্যাসের দামের অস্থিরতা রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। এর ফলে সরকারকে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে এবং ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পুনরায় গ্যাস বিক্রি করতে গিয়ে বড় অঙ্কের লোকসান বহন করতে হচ্ছে।

দেশের ভেতরে একসময় জ্বালানি ব্যবস্থার মূলভিত্তি ছিল যে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন, তা ক্রমেই কমছে। ফলে পরিকল্পনাকারীরা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কার্গো কেনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এই ঝুঁকিগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই অবস্থায় সরকার আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা জোরদার করছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন অনশোর টার্মিনাল, অতিরিক্ত ভাসমান সংরক্ষণাগার এবং পুনরায় গ্যাসীকরণ বা রি–গ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি নিশ্চিত করার বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাচ্ছে, যাতে দামের আকস্মিক ওঠানামার ঝুঁকি কমানো যায়। তবে এই অবকাঠামো স্থাপন করতে সময় লাগে এবং এতে যে বড় অঙ্কের মূলধন ব্যয় হয়, তা সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ইতিমধ্যেই চাপে থাকা সরকারি অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ

এই অনিশ্চয়তার মাঝেই সামনে আসছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ। রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে দুটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর রয়েছে। কয়েক বছর ধরে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির পর প্রকল্পটি চলতি বছরেই উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের কাছে রূপপুর একটি বড় আশার জায়গা। এটি নিরবচ্ছিন্ন বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে, যা আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং জ্বালানির দামের অস্থিরতা থেকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কিছুটা সুরক্ষা দেবে। পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীল ভূমিকা পালন করবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি

কাগজে-কলমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের জ্বালানি বিতর্কে একটি আশাব্যঞ্জক, কিন্তু বাস্তবে হতাশাজনক অধ্যায়। পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং সীমিত জমির মধ্যেও কিছুটা বায়ুশক্তির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ উচ্চাভিলাষী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বাধ্যবাধকতা এবং বড় আকারের সৌর প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের মতো নীতিগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো ও জলবায়ু উদ্বেগ মোকাবিলার ইঙ্গিত দেয়।

তবে বাস্তবে অগ্রগতি ধীর এবং গত দুই বছরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এই খাতকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং প্রকল্প অর্থায়নে বিলম্ব—সবকিছু মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে, নীতিগত সংকেত স্পষ্ট না থাকলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এই খাত পিছিয়ে পড়ছে।

সামনের পথচলা

নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, জ্বালানি নিরাপত্তা রাজনৈতিক আলোচনার একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি—যেগুলো যেন সব সময়ই নাগালের একটু বাইরে—ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার পতনের পর গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, কোনো ইসলামপন্থী জোট বা নতুন কোনো মধ্যপন্থী শক্তি—যেই সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো জ্বালানি খাত এবং দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশায় থাকা একটি দেশ উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে। এলএনজি আমদানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ—এই তিন বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত শুধু বিদ্যুতের দাম নয়, আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতাও নির্ধারণ করবে। এসব সিদ্ধান্ত দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়াই হবে দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন কেবল শীর্ষ পর্যায়ের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারবে—তার প্রকৃত পরীক্ষা। বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ।

জার্মান সংবাদমাধ্যম বিএনই ইন্টেলিনিউজ থেকে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত