Ajker Patrika

জ্বালানি সংকটে ফের কয়লায় ঝুঁকছে এশিয়া

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
জ্বালানি সংকটে ফের কয়লায় ঝুঁকছে এশিয়া
কয়লা বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে বায়ুমানের অবনতি ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় এবং দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখতে নিজেদের কঠোর পরিবেশগত অবস্থান থেকে সাময়িকভাবে সরে আসছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। জাপান সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর ইতিপূর্বে আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করার পরিকল্পনা করছে।

জাপানের শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাকাহিদে সোয়েদা এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল বৈঠকে এই পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হবে।

কেন আবার কয়লার দিকে ঝুঁকছে এশিয়া?

শুধু জাপান নয়, ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো নিরুপায় হয়ে পুনরায় কয়লার দিকে ঝুঁকছে। এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় অংশ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যার সিংহভাগ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে যুদ্ধকবলিত।

এত দিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি-কে কয়লা ও তেলের তুলনায় ‘পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় এলএনজি রপ্তানি বাড়াতে সচেষ্ট ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামায় ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো এলএনজি-র ঘাটতি মেটাতে কয়লা পোড়ানোর পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

দেশভিত্তিক প্রভাব ও জরুরি পদক্ষেপ

ভারত: বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা ব্যবহারকারী দেশ ভারত। তীব্র গরমের সময় বিদ্যুতের সম্ভাব্য ২৭০ গিগাওয়াট চাহিদা (যা স্পেনের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বিগুণ) সামাল দিতে কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে দেশটি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা মজুতসহ প্রায় তিন মাসের কয়লা বর্তমানে সংরক্ষিত আছে।

চীন: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২১ সাল থেকেই চীন রেকর্ড পরিমাণ কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেছে। তাদের জাতীয় নীতি অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটলেও কয়লাই থাকছে ব্যাকআপ হিসেবে প্রধান ভরসা।

ইন্দোনেশিয়া: বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়া এখন রপ্তানির চেয়ে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে কয়লার দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া: ২০৪০ সালের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের অঙ্গীকার থাকলেও বর্তমান এলএনজি সংকটের মুখে দেশটি সাময়িকভাবে কয়লা ব্যবহারের ওপর থেকে আইনি সীমা (ক্যাপ) তুলে নিয়েছে।

ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন: ভিয়েতনাম বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও লাওস থেকে আমদানির কথা ভাবছে। অন্যদিকে, ফিলিপাইন গত মঙ্গলবারই ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে।

পরিবেশগত ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ

কয়লার এই বর্ধিত ব্যবহার এশিয়ার বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ বা স্মগ (ধোঁয়াশা) পরিস্থিতিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর মতে, কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট সূক্ষ্ম ধূলিকণা (পিএম ২.৫) ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে মিশে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ভিয়েতনামের হ্যানয় বা ভারতের দিল্লির মতো শহরগুলোতে ইতিমধ্যে বায়ুদূষণ বিপজ্জনক সীমা ছাড়িয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জুলিয়া স্কোরুপসকার মতে, ‘এই সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কয়লা কেবল একটি সাময়িক তালি হতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান নয়।’

অর্থনৈতিক প্রভাব

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিউক্যাসল কোল (অস্ট্রেলিয়ার কয়লা)-এর দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, কয়লার ওপর এই সাময়িক নির্ভরতা কেবল পরিবেশকেই দূষিত করবে না, বরং আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিকেও অস্থির করে তুলবে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমানের এই ‘শর্ট-টার্ম ফিক্স’ বা সাময়িক সমাধান দীর্ঘ মেয়াদে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রাকে কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: এপি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ডিপ স্টেট’ ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল: আসিফ মাহমুদ

বৈশ্বিক ‘রেপ একাডেমির’ পর্দা ফাঁস, স্ত্রীকে ধর্ষণ শেখান স্বামীরা

আ.লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে গীতা পাঠে জামায়াত এমপির ‘বারণ’, শোনেননি ইউএনও

পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তায় ইরান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত