
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান যখন কোনো ছোট দল বা জনসমাবেশে বক্তব্য দেন, তখন প্রায়ই মনে হয় তাঁর সামনে থাকা জমায়েতের চেয়েও বড় কোনো শ্রোতামণ্ডলীর উদ্দেশে তিনি বক্তব্য দিচ্ছেন। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি রমজান মাসের প্রাক্কালে আঙ্কারার প্রাসাদে ৮০ জন প্রাদেশিক গভর্নরের উপস্থিতিতে দেওয়া তাঁর একটি ভাষণ দেখে মনে হচ্ছিল, সেটি কেবল তাদের জন্য নয়, বরং বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলিমের উদ্দেশে দেওয়া। মুসলিম বিশ্বের বিভক্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে চলা বিভক্তির জাঁতাকলে উম্মাহ যেন পিষ্ট না হয়। আমরা যদি আমাদের ভ্রাতৃত্ব, আমাদের বিশ্বাস এবং আমাদের স্বপ্নের প্রতি অবিচল থাকি, তবে আল্লাহর রহমতে এমন কোনো ফাঁদ নেই, যা আমরা ভাঙতে পারব না।’
আসলে ‘উম্মাহ’র কোনো একক মুখপাত্র নেই। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর থেকে মুসলিম বিশ্বে আর কোনো অবিসংবাদিত নেতা বা পরম ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নেই। বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টধর্মের মতো ইসলামও কেবল জাতীয়তার ভিত্তিতেই নয়, বরং বহু ফেরকা বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। অধিকাংশ মুসলিমের ভাষাও এক নয়, যদিও অনেকেই আরবিতে কোরআন পাঠ করেন। এরদোয়ান যখন তুর্কি ভাষায় কথা বলছিলেন, তখন তা কেবল বিশ্বের মুসলিমদের একটি ক্ষুদ্র অংশই বুঝতে সক্ষম।
ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনার জেমিল আয়দিন বলেন, একটি ‘কাল্পনিক মুসলিম সমাজ’ একজন মুখপাত্রের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, তবে এটি নিছক একটি ধারণামাত্র।
নেতা হওয়ার অডিশন
তবুও কয়েকজন রাজনীতিবিদ এই পদের জন্য ‘অডিশন’ দিচ্ছেন বলে মনে হয়। এরদোয়ান বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মুসলিমদের পক্ষে কথা বলে বিদেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন এবং দেশে ধর্মপ্রাণ ভোটারদের মন জয় করেছেন। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিজেকে মুসলিমদের ওপর জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নেতা হিসেবে চিত্রায়িত করেন। আবার সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ধর্মীয় উগ্রতার বদলে আধুনিকতা ও মধ্যপন্থার ওপর জোর দেন। প্রত্যেকেরই অনুসারী যেমন আছে, তেমনি আছে সমালোচক। তবে ‘আরব ব্যারোমিটার’ নামক একটি গবেষণা নেটওয়ার্কের নতুন জরিপ এবং অন্যান্য জনমত জরিপ বলছে, এরদোয়ানের দৃষ্টিভঙ্গিই বিশ্বের মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।
খামেনি প্রায়ই বর্তমান সংগ্রামগুলোকে ধর্মীয় আবহে তুলে ধরেন। তিনি শিয়া ধর্মাবলম্বী, কিন্তু বিশ্বের মোট মুসলিমদের ৮৫-৯০ শতাংশ হলো সুন্নি, যাদের ওপর তাঁর প্রভাব তুলনামূলক কম। তার ওপর ইরানি শাসনের দমন-পীড়ন নীতি তাঁর আবেদনকে ম্লান করেছে। এমনকি লেবানন বা ইরাকের মতো শিয়াপ্রধান দেশগুলোও এখন বর্ষীয়ান নেতা আয়াতুল্লাহর প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
কিছু সুন্নি আবার সিরিয়ার বিদ্রোহী নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া আহমেদ আল-শারাকে তাদের ধর্মের প্রকৃত রক্ষক মনে করছে। বাশার আল-আসাদের ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের বিরুদ্ধে তিনি ইসলামপন্থীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শিয়া ইরান-সমর্থিত একটি সরকারকে উৎখাত করার মাধ্যমে তিনি সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকের সুন্নিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সাম্প্রতিক কিছু অপ্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, জর্ডান ও সৌদি আরবেও শারা বড় সমর্থন পাচ্ছেন।
শারার তরুণ বয়স, পোশাকের রুচি এবং ইসলামপন্থা ও বাস্তববাদের মিশেল তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া পরিচালনার কঠিন চ্যালেঞ্জ দ্রুতই তাঁর সুনামে আঘাত হানতে পারে।
সৌদি আরবের প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানও একজন তরুণ নেতা, যিনি ব্যাপক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের জন্য পশ্চিমারা তাঁকে ঘৃণা করলেও মুসলিম বিশ্বে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। আরব ব্যারোমিটারের তথ্যমতে, সিরিয়ার ৮৭%, মরক্কোর ৬৮% এবং জর্ডানের ৫৮% মানুষের তাঁর আঞ্চলিক ভূমিকা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। ২০২১ সালে ইন্দোনেশীয়দের কাছেও তিনি জনপ্রিয়তম বিদেশি নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
প্রিন্স মোহাম্মদ ধর্ম নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না। মক্কা ও মদিনার খাদেম হিসেবে আগের সৌদি শাসকদের মতো তিনি ধর্মীয় বা নৈতিক নেতৃত্বের বিষয়ে খুব একটা উৎসাহ দেখান না। তিনি নিজেকে উম্মাহর মুখপাত্র বা নিপীড়িত মুসলিমদের ত্রাতা হিসেবেও দাবি করেন না। বরং সৌদি আরবে কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং সংগীত ও খেলাধুলার মতো ধর্মনিরপেক্ষ বিনোদন প্রচারের জন্য তিনি নিজ দেশে জনপ্রিয়। গাজা ইস্যুতেও তিনি খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, যাতে জনমত ক্ষুব্ধ না হয়।
বিপরীতে এরদোয়ান গাজায় ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেন না। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠেছিল এবং এখনো তা বেশ উঁচুতে রয়েছে। আরব ব্যারোমিটারের তথ্য বলছে, এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয়তম নেতা। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও তিনি বেশ সমাদৃত। ২০১৭ সালের গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানে তাঁর জনপ্রিয়তার হার ছিল যথাক্রমে ৪৫ এবং ২৭ শতাংশের বেশি। ইউরোপের মুসলিম এবং তুর্কি বংশোদ্ভূত দেশগুলোতেও তাঁর ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।
২০২০ সালে পাকিস্তান সফরের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ঠাট্টা করে বলেছিলেন, এরদোয়ান পাকিস্তানে নির্বাচন করলে অনায়াসেই জিতে যাবেন। এমনকি সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত শাসক আসাদও একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, এরদোয়ান সিরিয়াতে তাঁর নিজের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়।
শুরুতে এরদোয়ানের এই জনপ্রিয়তা অবাক করার মতো মনে হতে পারে। তুরস্ক একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং এর প্রেসিডেন্টের কোনো ধর্মীয় কর্তৃত্ব নেই। তা ছাড়া তাঁর শাসনামলে তুরস্কের গণতন্ত্র ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিজ দেশে তাঁর জনপ্রিয়তা কিছুটা কমছে। কিন্তু তাঁর বৈদেশিক ভক্তরা হয়তো তাঁর রাজনৈতিক ভুলগুলো উপেক্ষা করে তুরস্কের সমৃদ্ধি ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এরদোয়ানের জনপ্রিয়তার পেছনে শক্ত ভিত্তিও রয়েছে। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকায় তিনি প্রায় প্রতিটি মুসলিমপ্রধান দেশ সফর করার সুযোগ পেয়েছেন। ২০১১ সালে মোগাদিসু সফরের মাধ্যমে তিনি প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সোমালিয়া সফরকারী প্রথম অ-আফ্রিকান নেতা হয়েছিলেন। তুর্কি সাহায্য সংস্থা ও ব্যবসায়ীরা আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় ব্যাপক বিনিয়োগ করছে, যা তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
তিনি কেবল সফরই করেন না, বরং মুসলিম বিশ্বের ক্ষোভগুলোও তুলে ধরেন। কাশ্মীরের ইস্যুতে ভারতের সমালোচনা করা থেকে শুরু করে ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা এবং চীনে উইঘুরদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চকণ্ঠ। পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হোসেন বলেন, তাঁকে একজন সাহসী ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখা হয়, যিনি পশ্চিমাদের সামনে দাঁড়াতে পারেন।
এরদোয়ান পরিকল্পিতভাবে এই ইমেজ ধরে রাখেন। গত বছর ওআইসির বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ‘একটি বহুধাবিভক্ত বিশ্বে মুসলিমদের একটি নিজস্ব শক্তিতে পরিণত হতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ঐক্যের অভাব।’
এরদোয়ান ঠিক ঐক্যর প্রতীক নন। তাঁর সরকার লিবিয়া থেকে ইরাক পর্যন্ত বিভিন্ন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। তবে তিনি সংহতির নজিরও রেখেছেন, বিশেষ করে ৩০ লাখের বেশি সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে। ৬৯% সিরীয় তার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখে। বর্তমানে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে একটি ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠনের আলোচনাও চলছে।
আহমেদ আল-শারার মতো নতুন নেতারা হয়তো এরদোয়ানের জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এরদোয়ানই সবচেয়ে সফলভাবে মুসলিম বিশ্বের মনোযোগ ধরে রেখেছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

১৯৯৬ সালে প্রথমবার তালেবান ক্ষমতায় এলে ভারত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। সে সময় ভারত তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কও রাখেনি। তখন নয়াদিল্লি তালেবানকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার প্রক্সি হিসেবে দেখত। ওই সময় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত...
২ ঘণ্টা আগে
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘কৌশলগত সুবিধা’ পাওয়ার আশায় ইসলামাবাদের হাত ধরেই তালেবানের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের সেই মৈত্রীতে এখন চরম ফাটল ধরেছে।
৬ ঘণ্টা আগে
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন-ইরান উত্তেজনার চক্র একটি পরিচিত পথ অনুসরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাগাড়ম্বর, পারস্য উপসাগরে ইরানের সামরিক সংকেত, ওমানের মাধ্যমে পরোক্ষ কূটনীতি এবং ইসরায়েলের সতর্কবার্তা। তবে এই নাটুকেপনার আড়ালে তেহরানের ভেতরে আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমান সংকট ইরানের রাজনৈতিক
৬ ঘণ্টা আগে
ভারত বর্তমানে ইসরায়েলের অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা। প্রতি বছর ভারতের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধের মধ্যেও ভারতীয় সংস্থাগুলো ইসরায়েলে রকেট ও বিস্ফোরক বিক্রি করেছে।
১০ ঘণ্টা আগে