Ajker Patrika

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ: এর মানে কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০: ৪৯
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ: এর মানে কী
প্রতীকী ছবি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফে অক্টোবর–২০২৬ এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদন অনুসারে, এ বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ভারতের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জিডিপি হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। ভারতের জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড়। কিন্তু প্রতিবেশী বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি (যা মোট জিডিপিকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যায়) বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮৮৬ ডলার, যা ভারতের ২ হাজার ৭৪৯ ডলারের চেয়ে বেশি। গত দুই দশকে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে পাকিস্তানের চেয়েও বড়, যে দেশের কাছ থেকে ১৯৭১ সালে ঢাকা স্বাধীনতা অর্জন করেছিল।

বিশেষজ্ঞরা এই সাফল্যের পেছনে দেশের ৩৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক শিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন সেই অগ্রগতিকে চাপের মুখে ফেলছে। অন্যদিকে, এ বছর ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৩.৬ শতাংশ।

তাহলে এই সংখ্যাগুলোকে কীভাবে দেখা উচিত, আর দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য এগুলোর প্রকৃত অর্থ কী?

আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে কী রয়েছে

আইএমএফের প্রতিবেদনটিতে মূল্যস্ফীতি এবং দুটি প্রধান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি বাজারের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে সাড়া দেবে, তার পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে ভারতের জিডিপি হতে পারে ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) অনুযায়ী হিসেব করলে বাংলাদেশের এই মাথাপিছু জিডিপির লিড বা এগিয়ে থাকা উল্টে যায়, কারণ পিপিপিতে স্থানীয় পণ্যের দামের পার্থক্য সমন্বয় করা হয়। এই পরিমাপে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার।

পিপিপি হলো একটি অর্থনৈতিক সূচক, যা জীবনযাত্রার খরচ সমন্বয়ের পর বিভিন্ন দেশে টাকা দিয়ে বাস্তবে কী পরিমাণ কেনাকাটা করা যায় তা নির্দেশ করে। এই পরিসংখ্যানের অর্থ হলো, বাংলাদেশিদের চেয়ে ভারতীয়দের কেনাকাটার ক্ষমতা বা ক্রয়ক্ষমতা বেশি। আইএমএফ বাংলাদেশে গড় ভোক্তা-মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করেছে, যেখানে ভারতে তা ৫ শতাংশ। এটি বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বেশি হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে।

ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধশালী এবং দেশটির বড় আকারের শিল্প ভিত্তি রয়েছে, যার মধ্যে তাদের উল্লেখযোগ্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতও অন্তর্ভুক্ত। ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ৩.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ।

বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য উল্লেখ করা যায় যে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার এবং বিশ্বজুড়ে গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৫ হাজার ৮৮৯ ডলার—যার বিপরীতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৮৮৬ ডলার এবং ভারতের ২ হাজার ৭৪৯ ডলার।

ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে

আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, আগামী বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাবে, যা তখনও ভারতের ৩ হাজাার ৩৬ ডলারের চেয়ে বেশি থাকবে। এই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালেও এই সামান্য ব্যবধান বজায় থাকার কথা। তবে আইএমএফ জানিয়েছে, বর্তমান প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে ২০২৯ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে ৩ হাজার ৬৬১ ডলার, যা বাংলাদেশের ৩ হাজার ৩৩৪ ডলারকে ছাড়িয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের প্রাক্কলিত মাথাপিছু জিডিপি ভারতের চেয়ে সামান্য ওপরে উঠলেও, নিকট ভবিষ্যতে দেশটি দুর্বল প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতির মুখে পড়ছে।

তবে কেবল মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে একটি দেশের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চিত্র বোঝা যায় না, কারণ এটি আয় ও সম্পদের বৈষম্যকে লুকিয়ে রাখে। এ ছাড়া ডলারে হিসাব করা এই সংখ্যাটি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। এর অর্থ হলো, অর্থনৈতিক উৎপাদনে কোনো পরিবর্তন না হলেও কেবল মুদ্রার মানের পরিবর্তনের কারণেই এই আপেক্ষিক সংখ্যা বদলে যেতে পারে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল রপ্তানিমুখী ম্যানুফ্যাকচারিং খাত নির্ভর—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস ছিল। এর পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সও বড় ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে, ভারতের রয়েছে একটি বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি, যেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং ও কৃষির পাশাপাশি সেবা খাত বড় ভূমিকা পালন করে। দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজার, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা, শিল্প ভিত্তি এবং দেশীয় গ্রাহকদের চাহিদা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বহুমাত্রিক উৎস জোগায়।

তবে উভয় দেশেই গত এক দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুষম হয়নি; বরং ধনী পরিবারগুলোতে সম্পদের কেন্দ্রীয়করণ বা পুঞ্জীভূত হওয়া বেড়েছে।

বাংলাদেশ কি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ার একটি সাফল্যের গল্প?

কিছুটা হলেও তাই, অর্থনীতিবিদরা অসম প্রবৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে এ কথা বলেছেন। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতি বছরে ৬ শতাংশ হারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের মোট মূলসংযোজনে (গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড) ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অপরদিকে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ভারতের জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের মূল্যসংযোজন ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, ‘রপ্তানিমুখী ম্যানুফ্যাকচারিং প্রবৃদ্ধির এটি একটি ইতিবাচক দিক, যা বাংলাদেশ সঠিকভাবে করতে পারছে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ঢাকাকে ধাক্কা দিয়েছে, কারণ এই যুদ্ধ হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৯৫ শতাংশ আমদানি করে এবং এর বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

একইসঙ্গে, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি যে তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে, লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথ বিঘ্নিত হওয়ায় সেই খাতের পণ্য পরিবহনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত