Ajker Patrika

আল জাজিরার বিশ্লেষণ: খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার কি তাঁর ছেলে এগিয়ে নিতে পারবেন?

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২: ১৮
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের চত্বর গত মঙ্গলবার এক বিষণ্ন শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। হাসপাতাল থেকে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘদিনের নেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা জাতি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। গত ২৩ নভেম্বর রাত থেকে তিনি ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সমর্থক, দলীয় নেতা এবং সাধারণ মানুষ হাসপাতালের গেটের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকের চোখে পানি, কেউবা প্রার্থনা করছিলেন। বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলেন, ‘খবরটা শোনার পর ঘরে বসে থাকা সম্ভব হয়নি। তাঁকে দেখার কোনো সুযোগ নেই, তাই সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে। সবার চোখেই পানি।’

বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় সারা দেশ থেকে বিএনপির লাখো সমর্থক ও সাধারণ মানুষ সমবেত হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার কেবল বাংলাদেশের সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শোকের বাইরে খালেদা জিয়ার মৃত্যু একটি সংকটময় মুহূর্তে বিএনপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিচ্ছেদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। বছরের পর বছর অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও যিনি দলের ঐক্যের চূড়ান্ত প্রতীক ছিলেন; সেই নেত্রীকে ছাড়াই এখন নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে দলটিকে।

তাঁর প্রয়াণে বিএনপি এখন পুরোপুরি ‘খালেদা-উত্তর’ যুগে প্রবেশ করল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখন সব ক্ষমতা ও জবাবদিহির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন তাঁর ছেলে ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ধ্রুবতারা হিসেবে রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ও আগামীর পরীক্ষা

কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা কেবল আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনীতির সম্মুখভাগে অনুপস্থিত থাকার সময়েও তিনি ছিলেন দলের নৈতিক ভারকেন্দ্র এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। তাঁর উপস্থিতির কারণেই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিতে পারেনি এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে কারও মনে সংশয় ছিল না।

তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন আল জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ একজন ‘প্রকৃত অভিভাবক’ হারিয়েছে। তিনি খালেদা জিয়াকে সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এক ঐক্যবদ্ধ প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিএনপি নির্বাচিত হলে খালেদা জিয়ার নীতি ও সুশাসনের অগ্রাধিকারগুলোকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে।

মাহদী আমিন বলেন, ‘তাঁর রাজনীতির বৈশিষ্ট্য ছিল শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র—আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।’ তিনি আরও দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে যেসব প্রতিষ্ঠান ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, বিএনপি সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে চায়।

মাহদী আমিন জোর দিয়ে বলেন, তারেক রহমান ইতিমধ্যে একজন ঐক্যবদ্ধ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন সমন্বয় এবং ভোটাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিতে ৩১ দফার সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়নে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সেই প্রতীকী শক্তিকে সরিয়ে দিয়েছে। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমা দলটিকে উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে বড় ভূমিকা পালন করত। তিনি বলেন, ‘সেই ছন্দে এখন বিঘ্ন ঘটবে। তারেক রহমানকে এখন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। তাঁর নেতৃত্ব এখনো পরীক্ষিত নয়।’

মহিউদ্দিন আহমদ মনে করিয়ে দেন, খালেদা জিয়া নিজেও একসময় রাজনীতিতে অপরীক্ষিত ছিলেন। আশির দশকে সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের সময় তিনি জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। তাঁর স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।

মহিউদ্দিন আহমদ যুক্তি দেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তারেক রহমানের জন্য একইভাবে ভাগ্যনির্ধারক হতে পারে: সাফল্য তাঁর নেতৃত্বকে বৈধতা দেবে, আর ব্যর্থতা তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

কঠিন নির্বাচনী ময়দান

বিরোধী রাজনৈতিক মেরুকরণ বদলে যাওয়ায় বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন ছিল মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দ্বিমুখী লড়াই। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর নব্বই ও ২০০০-এর দশকের নির্বাচনগুলোতে এই ধারাটিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বর্তমান ড. ইউনূসের সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করায় সেই দ্বিমুখী আধিপত্য এখন ভেঙে গেছে। বিএনপিকে এখন অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মাঠে লড়তে হচ্ছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় ইসলামি শক্তিগুলোর নেতৃত্বাধীন জোট রয়েছে। জামায়াতের এই জোটে ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’র (মূলত জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি) মতো দলও আছে। এই দলটি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের তরুণ নেতাদের গঠিত রাজনৈতিক দল, যাঁরা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে নির্বাসিত হতে বাধ্য করেছেন।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিএনপির জন্য কাজটা সহজ হবে না। ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে এবং দুই দলের সেই পুরোনো আধিপত্য এখন আর নেই।’

বিশ্লেষকেরা কিছু অনিশ্চয়তার কথাও বলছেন—নির্বাচন ঠিক সময়ে হবে কি না, তা শান্তিপূর্ণ হবে কি না এবং বড় দলগুলো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী খালেদা জিয়া ও তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান—উভয়কেই কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া কেবল দলের জন্য নন, বরং দেশের জন্য একজন ‘অভিভাবক’ ছিলেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন জ্যেষ্ঠ স্থিতিশীল ব্যক্তিত্বের অভাব তৈরি করল।

তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো বন্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। দিলারা চৌধুরী মনে করেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির আশঙ্কা কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্বৈরতন্ত্র বর্জন এবং ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেওয়া তাঁর সাম্প্রতিক ভাষণগুলো সমর্থকদের আশ্বস্ত করেছে।

দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল ছিল। খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমানই স্বাভাবিকভাবে বিএনপির সেই জায়গাটি দখল করেছেন।’

উত্তরাধিকার থেকে জনরায়

বিএনপির নেতারা স্বীকার করছেন, কেবল উত্তরাধিকার দিয়ে দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। কিছু দলীয় কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠছে, যাকে উপদেষ্টা মাহদী আমিন ‘অতিরঞ্জিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি জানান, কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দল এটি মোকাবিলা করবে।

তৃণমূল পর্যায়ে কোনো কোনো সদস্য মনে করছেন, তারেক রহমানের এই নেতৃত্বের উত্তরণ চ্যালেঞ্জমুক্ত হবে না। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘অসুবিধা হবে না বলাটা বাস্তবসম্মত হবে না। অতীতে খালেদা জিয়া বা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাজ করা জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মতভেদ দেখা দিয়েছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে আমি বিশ্বাস করি, তিনি তা সামলাতে পারবেন।’

কামাল উদ্দিন আরও তিনজন কর্মীর সঙ্গে কক্সবাজার থেকে ৩৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বুধবার খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকা এসেছিলেন।

তবে বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা তারেক রহমানের কর্তৃত্ব নিয়ে কোনো সংশয় দেখছেন না। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০০১-২০০৪ মেয়াদে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্ব ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘তাঁর নেতৃত্ব প্রমাণিত। তিনি কার্যকরভাবে দলকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।’

নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার এই সময়ে বিশ্লেষকেরা বলছেন, দলের শৃঙ্খলা রক্ষা, সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে অবদান রাখাই হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মধ্যে আলাদা একটি আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ২৯ নভেম্বর দেশে ফেরার আগে তারেক রহমান তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, ফেরার সিদ্ধান্ত ‘পুরোপুরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই।’ সমালোচকেরা একে তাঁর ফেরার পেছনে বাইরের কোনো শক্তির (বিশেষ করে ভারত) প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

বিএনপি নেতারা অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে, তাঁর ফেরা ছিল নিছক রাজনৈতিক ও আইনি বিষয় এবং দল ক্ষমতায় গেলে জাতীয় স্বার্থই হবে তাঁদের নীতির মূল ভিত্তি। তবে অনেক সমর্থকের কাছে এই রাজনীতি খুবই আবেগময় ও ব্যক্তিগত। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা ৫৭ বছর বয়সী দুলাল মিয়া গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় তারেক রহমানের সংবর্ধনা সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি আজও ১৯৭৯ সালের সেই মুহূর্তটির কথা মনে করেন, যা তাঁকে আজীবন বিএনপির সমর্থক বানিয়ে দিয়েছে।

তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি ধানখেত পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান সারা দেশে খাল খনন এবং প্রটোকল ছাড়া খালি পায়ে দুর্গম এলাকা সফরের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। দুলাল মিয়া বলেন, ‘তারেক রহমানকে তাঁর মা-বাবার সেই উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। যদি তিনি তা না করেন, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। বিএনপির রাজনীতি হলো মানুষের রাজনীতি, যা শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান আর এত দিন টেনে নিয়েছেন খালেদা জিয়া। আমি বিশ্বাস করি তারেক রহমানও তা-ই করবেন। অন্যথায় জনগণই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত