‘তোমার না প্রেমের বিয়ে? তাইলে এত মন খারাপ করে আছো ক্যান? হাসো।’
আমি বাল্যবন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝলাম এই মন খারাপ তার মা-বাবার জন্য। বন্ধুর মতো আগলে রাখা ভাই-বোনের জন্য। পরিবারের আদুরে ছোট্ট সদস্যটার জন্য। তাঁদের ছেড়ে একদম অপরিচিত একটা পরিবারে অজানা আশঙ্কায় মন বেঁধেই তাকে যেতে হবে। আমার বন্ধুর যে ভালোলাগা-মন্দলাগার এক মিশ্র অনুভূতি হচ্ছিল, সেটা বুঝতে পারছিলাম। প্রেমের বিয়ে হোক কিংবা পরিবারের পছন্দে হোক, বিয়ের দিন কনের মন খারাপ হতে পারবে না, এটা কোথায় লেখা আছে, জানেন? কিছুটা আঁচ করতে পারি, আমাদের দেশের পশ্চাৎ মস্তিষ্কের শিরায় শিরায়।
এরপর আরও কথা থেকে যায়। কনের বাড়ি থেকে কী কী দিল, সেটার ফর্দ বরের বাড়ির আত্মীয়-অনাত্মীয় বা প্রতিবেশীরা না দেখা পর্যন্ত সদ্যবিবাহিত কনেকে কথায় কান দিতে হয়। ভাবতে অবাক লাগে, শিক্ষিত সমাজেও এসব চলে দেখছি! ‘যৌতুক’ শব্দটা ব্যবহার করবে না কেউ, এতটা আধুনিক অবশ্য হওয়া গেছে। শুধু বলা হবে, ‘না, না এটা যৌতুক নয়। বাপের বাড়ি থেকে তো মেয়েকে এমনিতেই উপহার দেয়। এটা আবার বলা লাগে নাকি!’ বলছি শুধু মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। নিম্নবিত্তদের গল্পটা অন্য রকম, সরাসরি মারমার-কাটকাট কথা হয়। জানেন তো, নাকি?
মাত্র সেদিনই খবরটা পড়লাম, ভোলার মনপুরার একটি ঘটনা। ভালোয় ভালোয় বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিপত্তি বাধে বউভাতের দিন। যৌতুক নিয়ে দুই পক্ষের তর্কযুদ্ধের একপর্যায়ে বর-কনে আস্তে করে সেখান থেকে সটকে পড়েন। তাঁরা পালিয়ে কোথায় গেছেন, কীভাবে আছেন সে খবর অবশ্য এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। কনের বাবা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। কনেপক্ষের কয়েকজনকে বরপক্ষ মেরে আহত করেছেন বলে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। ওই মারধরের জন্যই অভিযোগ হয়, যৌতুকের
জন্য নয়।
এটা যেন অলিখিত সংস্কৃতি—যৌতুক বা উপহার দিতে না পারলে মেয়ের বিয়ে হবে না। অথবা যে মেয়ের বাড়ি থেকে উপঢৌকন না আসবে, সেখানে ছেলেকে বিয়ে করানো যাবে না। কী এক অদ্ভুত সমাজে বাস করছি আমরা। লোকে কী না বলে আর সেই বলায় কান দিয়ে দিয়ে আমরা আমাদের ‘আজব’ সংস্কৃতির চর্চা করি। এক মধ্যবিত্তের বিয়েতে কনেপক্ষ কোনো ‘ঘর সাজানোর উপহার’ দেয়নি। ছেলের বাবা লজ্জায় চাইতেও পারেননি। ওই যে ‘এটা আবার বলা লাগে নাকি’! ব্যাপারটা মাথায় ঢেউ খেলে আরকি। নিজেই তাই ‘ঘর সাজানোর উপহার’ হিসেবে খাট, সোফা, ড্রেসিং টেবিল কিনে ছেলের ঘর সাজিয়েছেন। প্রতিবেশীদের বলেছেন, কনের বাড়ি থেকে পাঠিয়েছে! শুধু ‘লোকে কী বলবে’র পাত্তায় পড়েই শিক্ষিত বাবা হয়েও এ কাজটা করেছেন বাধ্য হয়ে। সেই বাবার জন্য সমবেদনা।
এহেন চর্চা চলতে চলতে সেই নবদম্পতির ওপরেও কিন্তু একদিন সেটা বর্তে যায়। না চাইতেও তাঁদের এই সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এই লোকের কথায় কান দিয়ে একসময় নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। অথচ এই লোকজন কখনো তাঁদের পরিবারের সমস্যা সমাধান করতে আসেন না। মাসে মাসে রসদ দিয়ে যান না দোরগোড়ায়। তাঁদের সংসার পরিচালনা করেন না। তারপরও লোকের কথায় কান দিতে হয়। কেননা, আমরা সামাজিক জীব। সমাজ নিয়ে চলতে হয়। সমাজের নিয়ম মেনে চলতে হয়। তবু সমাজের ‘আজব’ সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হয় না। আমরা বলতে পারি, ‘সমাজ বদলে দেব। হ্যান করব, ত্যান করব।’ আদতে আমরা ‘ঐতিহ্য’ ধরে রাখতে ভালোবাসি—সত্যিকারের নয়, বাকওয়াসগুলো!

আলতাফ পারভেজ লেখক ও গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর। ডাকসুর নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনঃপাঠ’, ‘শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম’, ‘গ্রামসি ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা’ প্রভৃতি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বই।
৬ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরগুলো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদের ভান্ডার। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হাওর বিস্তৃত। এ হাওরগুলো শুধু অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত নয়...
৬ ঘণ্টা আগে
বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছে ভাই। সিলেটের জকিগঞ্জে ঘটেছে এই ঘটনা। খেলা দেখার সময় উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলে চাচাতো ভাই নিষেধ করেছিলেন। তা নিয়েই ছড়ায় আরও উত্তেজনা।
৭ ঘণ্টা আগে
আমার বয়সী অনেক বন্ধু বলে, বন্ধু, আসো না একদিন একটু আড্ডা দিই। শুনে হাসি পায়। আড্ডা দেওয়ার জন্য এ রকম আমন্ত্রণ জানাতে হয়! আমার নীরবতা লক্ষ করে তারপর বলে, এসো খাওয়া-দাওয়া হবে, অনেক দিন পরে আমরা বেশ কয়েকজন একসঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠব।
১ দিন আগে